ফারহান তানভীর :
বাংলা সিনেমায় ভিলেন মানেই একসময় যাদের মুখ ভেসে উঠত, তাদের অন্যতম ছিলেন ইলিয়াস কোবরা। পর্দায় তার উপস্থিতি মানেই ভয়ংকর দৃষ্টি, শক্তিশালী সংলাপ আর নায়কের সঙ্গে জমজমাট লড়াই। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে অসংখ্য জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে খল চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শকের কাছে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছেন। তবে সিনেমার পর্দায় যে মানুষটিকে সবাই ভয়ংকর রূপে দেখেছেন, বাস্তব জীবনে তিনি একেবারেই ভিন্ন। বয়স সত্তরের কাছাকাছি হলেও এখনও কর্মব্যস্ত জীবন কাটাচ্ছেন তিনি আর সেই জীবন আবর্তিত হচ্ছে গ্রাম, কৃষি ও সমাজসেবাকে ঘিরে।

সম্প্রতি নিজের বর্তমান জীবন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ইলিয়াস কোবরা জানান, তিনি এখন গ্রামে ফিরে স্থানীয় মসজিদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। শুধু তাই নয়, জীবিকার জন্য এবং নিজের ভালোবাসা থেকেই পানের বরজ ও পেঁপের চাষ করছেন। রয়েছে গরুর খামার, নিয়মিত হালচাষও করেন। পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করার কারণে স্থানীয় মানুষের নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয়ভাবে অংশ নেন তিনি। তার ভাষায়, বয়স সত্তরের কাছাকাছি পৌঁছালেও এখনও তিনি পুরোপুরি সুস্থ আছেন এবং নিজের সব কাজ নিজেই করতে পারেন।
তার এই জীবনযাপন অনেকের কাছেই বিস্ময়কর মনে হতে পারে। কারণ, যে মানুষটি একসময় ক্যামেরার সামনে ভয়ংকর খলনায়কের চরিত্রে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন, তিনিই এখন মাঠে-ঘাটে কৃষিকাজ করছেন, গরুর খামার দেখাশোনা করছেন এবং সমাজের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করছেন। তবে ইলিয়াস কোবরার কাছে এটিই জীবনের স্বাভাবিক পথ। অভিনয়ের বাইরেও যে একজন শিল্পীর আরেকটি বাস্তব জীবন থাকে, সেটিই যেন তিনি নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে চলেছেন।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে ইলিয়াস কোবরা দীর্ঘ সময় ধরে খল অভিনেতা হিসেবে কাজ করেছেন। নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে অসংখ্য ব্যবসাসফল ছবিতে তাকে দেখতে পেরেছেন চলচ্চিত্র প্রেমীরা। তার শক্তিশালী শারীরিক গঠন, চোখের অভিব্যক্তি এবং পর্দায় উপস্থিতির কারণে পরিচালকরা প্রায়ই তাকে ভয়ংকর ভিলেনের চরিত্রে বেছে নিতেন। নায়ক-নায়িকাদের সঙ্গে তার সংঘর্ষের দৃশ্যগুলো দর্শকদের কাছে ছিল বেশ উপভোগ্য। অনেক জনপ্রিয় নির্মাতা ও শীর্ষ নায়কের সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন এবং নিজের অভিনয় দক্ষতার মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রে আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন।তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চলচ্চিত্রের ধরনও বদলেছে। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের আগমন, গল্প বলার ভিন্ন ধারা এবং চলচ্চিত্র শিল্পের নানা পরিবর্তনের কারণে অনেক অভিজ্ঞ শিল্পীর মতো ইলিয়াস কোবরাকেও ধীরে ধীরে অভিনয় থেকে দূরে সরে যেতে হয়েছে। কিন্তু তিনি এই ব্যাপারকে কখনোই আক্ষেপ হিসেবে দেখেন না। বরং গ্রামের শান্ত পরিবেশ, কৃষিকাজ এবং মানুষের সেবার মধ্যেই খুঁজে পেয়েছেন নতুন এক প্রশান্তি।
জীবনের একটি সময় ক্যামেরার সামনে কাটালেও অবসর জীবনে তিনি নিজেকে অলস করে রাখেননি। কৃষিকাজকে সম্মানজনক পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং সমাজের মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছেন। স্থানীয় মসজিদের সভাপতির দায়িত্ব পালন থেকে শুরু করে এলাকার সামাজিক বিভিন্ন উদ্যোগে অংশ নেওয়া-সবকিছুই তিনি সমান গুরুত্বের সঙ্গে করে যাচ্ছেন।

আজকের সময়ে যখন অনেকেই অবসরের পর নিষ্ক্রিয় জীবন বেছে নেন, তখন ইলিয়াস কোবরার জীবন অন্যরকম একটি উদাহরণ তৈরি করে ফেলেছেন।বয়স যে কেবলই একটি সংখ্যা এবং ইচ্ছাশক্তি আর কর্মস্পৃহা থাকলে মানুষ যেকোনো বয়সেই সক্রিয় থাকতে পারে-তার জীবন যেন সেই বার্তাই দেয়। সিনেমার পর্দায় তিনি ছিলেন ভয়ংকর ভিলেন, কিন্তু বাস্তব জীবনে তিনি একজন পরিশ্রমী কৃষক, দায়িত্বশীল সমাজসেবক এবং নিজের শিকড়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একজন মানুষ। আর এ কারণেই ইলিয়াস কোবরার গল্প শুধু একজন চলচ্চিত্র অভিনেতার গল্প নয়, বরং আলো-ঝলমলে রূপালি পর্দার বাইরে এক সাধারণ অথচ অনুপ্রেরণাদায়ী জীবনের গল্পও।