অভিনয় করবেন তবে কোনো ধরনের চুম্বন বা অন্তরঙ্গ দৃশ্য করতে রাজি নন সাই পল্লবী…

ফারহান তানভীর:

বর্তমান চলচ্চিত্র জগতে যেখানে সাহসী দৃশ্য, রোমান্টিক মুহূর্ত কিংবা পর্দার ঘনিষ্ঠতা বাণিজ্যিক সাফল্যের একটি অন্যতম উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়, সেখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেত্রী সাই পল্লবী। তিনি মনে করেন, একজন শিল্পীর সাফল্য কেবল ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে অভিনয়ের ওপর নির্ভর করে না; বরং অভিনয় দক্ষতা, চরিত্রের গভীরতা এবং নিজের নীতিবোধই একজন শিল্পীকে দীর্ঘ সময় দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে দেয়। ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জায়গা থেকে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন,“বাস্তব জীবনে যদি তার একজন প্রেমিক বা জীবনসঙ্গী থাকে, তাহলে অভিনয় হোক কিংবা অন্য কোনো কারণেই হোক, তিনি অন্য কাউকে চুম্বন করবেন না।”

সাই পল্লবীর এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই তার এই অবস্থানকে ব্যক্তিগত মূল্যবোধের প্রতি সম্মান হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ মনে করছেন এটি সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, যা একজন শিল্পী হিসেবে নেওয়ার পূর্ণ অধিকার তার রয়েছে। নিজের বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, সুখে থাকার জন্য একজন মানুষের একটি ভালো পরিবার, একটি গাড়ি এবং মাথা গোঁজার জন্য একটি বাড়িই যথেষ্ট। তার জীবনে এই প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো রয়েছে। তাই শুধু আরও একটি গাড়ি কেনা বা অর্থ উপার্জনের জন্য তিনি নিজের নীতির সঙ্গে আপস করতে রাজি নন।

স্পষ্টভাবে তাই বলাই যায়,পল্লবীর কাছে অর্থ কিংবা বিলাসিতা জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়। বরং আত্মসম্মান, মানসিক শান্তি এবং নিজের বিশ্বাসের প্রতি অটল থাকাই সবচেয়ে বড় বিষয়। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, যদি কোনো পরিচালক তার অভিনয় দক্ষতার জন্য তাকে নির্বাচন করতে চান, তাহলে তিনি অবশ্যই কাজ করবেন। কিন্তু যদি শুধুমাত্র ঘনিষ্ঠ দৃশ্য বা চুম্বনের প্রয়োজনের কারণেই তাকে নেওয়া হয়, তাহলে সেই চরিত্র অন্য কাউকে দেওয়াই ভালো। এতে তার কোনো আপত্তি নেই।

দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রে সাই পল্লবীর যাত্রা শুরু হয় ২০১৫ সালে মালয়ালাম চলচ্চিত্র ‘প্রেমম’-এর মাধ্যমে। প্রথম সিনেমাতেই ‘মালার’ চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শকদের হৃদয় জয় করে নেন। এরপর ‘ফিদা’, ‘মিডল ক্লাস আব্বাই’, ‘লাভ স্টোরি’, ‘শ্যাম সিংহ রায়’, ‘গার্গী’, ‘অমরন’সহ একাধিক সফল সিনেমায় অভিনয় করে নিজেকে সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য, মেকআপবিহীন উপস্থিতি এবং সহজ-সরল জীবনযাপনও তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

অনেকেই হয়তো জানেন না, সাই পল্লবী পেশাগতভাবে একজন চিকিৎসক। তিনি জর্জিয়ার তিবলিসি স্টেট মেডিকেল ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করেছেন। যদিও চিকিৎসক হওয়ার সুযোগ ছিল, শেষ পর্যন্ত অভিনয়কেই নিজের পেশা হিসেবে বেছে নেন। তবে চিকিৎসা শিক্ষার অভিজ্ঞতা এবং পারিবারিক মূল্যবোধ তার ব্যক্তিত্বে গভীর প্রভাব ফেলেছে বলেই মনে করেন অনেক ভক্ত।

সাই পল্লবীর ক্যারিয়ারের আরেকটি বিশেষ দিক হলো, তিনি সবসময় গল্প ও চরিত্রকে প্রাধান্য দেন। কোনো সিনেমায় অভিনয়ের আগে তিনি চরিত্রটির গুরুত্ব, গল্পের মান এবং নিজের নীতিবোধের সঙ্গে সেটি কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ-এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন। এজন্যই তাকে বছরে খুব বেশি সিনেমায় দেখা যায় না। কম কাজ করলেও প্রতিটি চরিত্রে নিজের ছাপ রেখে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।

পর্দায় চুম্বন বা ঘনিষ্ঠ দৃশ্য না করার সিদ্ধান্ত অবশ্য পল্লবীর নতুন নয়। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই তিনি এই অবস্থানে অটল রয়েছেন। চলচ্চিত্রজগতের অনেকেই মনে করেন, এমন শর্ত দিলে একজন অভিনেত্রীর কাজের সুযোগ কমে যেতে পারে। কিন্তু সাই পল্লবীর ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। তার অভিনয় দক্ষতা, নাচের পারদর্শিতা এবং দর্শকদের ভালোবাসাই তাকে এমন অবস্থানে নিয়ে গেছে, যেখানে তিনি নিজের শর্তে কাজ করার আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছেন।

দর্শকদের কাছেও সাই পল্লবীর গ্রহণযোগ্যতার অন্যতম কারণ তার স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব। তিনি কখনোই নিজেকে অযথা গ্ল্যামারের প্রতিযোগিতায় জড়াননি। বরং স্বাভাবিক জীবনযাপন, মাটির কাছাকাছি থাকা এবং নিজের মতাদর্শে অটল থাকার কারণেই কোটি কোটি মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার নাম হয়ে উঠেছেন। তার ভক্তদের মতে, একজন শিল্পী হিসেবে যেমন তিনি অসাধারণ, তেমনি একজন মানুষ হিসেবেও নিজের মূল্যবোধ ধরে রাখার সাহস দেখিয়েছেন।

আগামী দিনেও সাই পল্লবীকে বেশ কয়েকটি বড় বাজেটের সিনেমায় দেখা যাবে। বিশেষ করে বলিউডে তার অভিষেক নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ তুঙ্গে। তবে নতুন ভাষা, নতুন ইন্ডাস্ট্রি কিংবা বড় প্রযোজনা-কোনো কিছুই তার ব্যক্তিগত নীতিকে বদলে দিতে পারেনি। বরং বারবার তিনি প্রমাণ করেছেন, সফল হওয়ার জন্য সব সময় সবার মতো চলতে হয় না। নিজের বিশ্বাস, সীমারেখা এবং আত্মসম্মান অটুট রেখেও একজন শিল্পী দর্শকের ভালোবাসা অর্জন করতে পারেন। আর সাই পল্লবীর এই স্পষ্ট অবস্থানই তাকে শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী নয়, বরং নিজের নীতিতে অবিচল একজন ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব হিসেবেও আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছে।