ফারহান তানভীর :
একদিন বাবা তাঁকে ডেকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন, “তুমি এসব সিনেমায় কী করছো? সবাই বলে আমার ছেলে তো শুধু মার খায়! কেন এমন চরিত্র নাও?” প্রশ্নটা ছিল কঠিন, আর জবাব ছিল আরও কঠিন। নওয়াজ বলেছিলেন, তাঁর হাতে যে আর কোনো বিকল্প ছিল না-যা সুযোগ মিলেছে, তাই আঁকড়ে ধরে এগোচ্ছেন। কিন্তু বাবা তাতে সন্তুষ্ট হননি। তাঁর উত্তর ছিল, “তাহলে মার খেয়ে এখানে এসো না!” সেই কথাটা নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকীকে এমনভাবে আঘাত করেছিল যে, সে কষ্টে তিনি টানা তিন বছর গ্রামে ফিরে যাননি।

এই এক ঘটনাতেই ধরা পড়ে অভিনেতা নওয়াজের জীবনযুদ্ধের গভীরতা। তাঁর গল্পটা কারও মতো নয়-ধারালো অভিজ্ঞতা, কঠিন সময়, এবং অবিশ্বাস্য ধৈর্য দিয়ে তৈরি এক যাত্রা। ভারতের মুজফ্ফরনগরের বুদানায় গ্রামের ছেলে নওয়াজ অভিনয় শেখার স্বপ্ন নিয়ে পা রেখেছিলেন দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায়। সেখানেই তিনি জানলেন, শিল্পী হওয়া মানে কেবল অভিনয় জানা নয়-নিজেকে প্রতিদিন নতুন করে নির্মাণ করা।
মুম্বাইয়ে এসে তাঁকে যা অপেক্ষা করছিল, তা আরও নির্মম। অডিশনের লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও সুযোগ মিলত না। যেটুকু কাজ পাওয়া যেত, তাও এক-দুই মিনিটের চরিত্র। অধিকাংশই নামহীন, সংলাপহীন রোল-গ্যাংস্টারের সহকারী, পুলিশের সামনে দাঁড়ানো এক সাধারণ লোক, অথবা কোনো দৃশ্যে মার খাওয়া মানুষ। তাঁর নিজের ভাষায়, “আমি এমন অনেক চরিত্র করেছি যেখানে শুধু মার খাওয়া ছাড়া করার কিছুই ছিল না।” কিন্তু সেই ছোট ছোট ভূমিকাগুলোই তাঁকে ভিতরে ভিতরে গড়ছিল।

হতাশা ছিল, অভাব ছিল, কিন্তু হার মানা ছিল না। নওয়াজ জানতেন, বড় কোনো ব্রেক পাওয়ার আগে তাঁকে চরিত্র ভাঙার ধৈর্য রাখতে হবে। মাটির গন্ধ থেকে উঠে আসা তাঁর অভিনয়-সত্তা কখনো চোখে পড়ে, কখনো পড়ে না-তবু তিনি অপেক্ষা করেছেন।
এই অপেক্ষার ফল এসেছিল ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’তে, তারপর ‘নিউ ইয়র্ক’-যদিও দুইটাই ছোট চরিত্র। কিন্তু ঘটনার বাঁক সত্যিকারের ঘুরে যায় যখন ২০১২ সালে আনুরাগ কশ্যপের ‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’ মুক্তি পায়। সেদিন যেন বলিউড নতুন এক নওয়াজকে আবিষ্কার করেছিল। শুধু অনস্ক্রিন উপস্থিতিই নয়, তাঁর চোখ, শরীরী ভাষা, সংলাপ বলার ধরন-সব মিলিয়ে নওয়াজ বুঝিয়ে দিলেন তিনি আর সাইড চরিত্রের অভিনেতা নন; তিনি সিনেমা বহন করার মতো শক্তিমান শিল্পী।

এরপর যে চরিত্রগুলো এলো-‘দ্য লাঞ্চবক্স’-এর একাকীত্বের অদ্ভুত নীরবতা, ‘মান্টো’র বিপ্লবী স্পিরিট, ‘রামান রাঘব’-এর ভয়ঙ্কর মানসিকতা কিংবা ‘বদলাপুর’-এর তীক্ষ্ণ বাস্তবতা-এসবই তাঁর ক্যারিয়ারের মাইলফলক। নওয়াজের অভিনয়ের বিশেষত্ব হলো বাস্তবের কাছে থাকা। তিনি কখনো বাড়িয়ে কথা বলেন না, বাড়িয়ে অভিনয়ও করেন না। তাঁর চরিত্রগুলো যেন রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে দেখা সাধারণ মানুষদেরই প্রতিচ্ছবি।
সমালোচকরা একবাক্যে বলেন, তিনি ভারতের সবচেয়ে বাস্তবধর্মী অভিনেতাদের একজন। দর্শকের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। বলিউডের চকচকে তারকার ভিড়ে নওয়াজ প্রমাণ করেছেন-শিল্পী হওয়া মানে বড় কোনো নাম নয়; গভীর কোনো সত্যকে জীবন্ত করে তোলা।

আজ যখন তাঁর হাতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, জাতীয় পুরস্কার, মর্যাদাপূর্ণ ফেস্টিভ্যালের প্রশংসাপত্র-তখন বাবার দেওয়া সেই কথাটিই তাঁর মাথায় বারবার ফিরে আসে। নওয়াজ নিজেই বলেন, “বাবার সেই কথাটা আমাকে বদলে দিয়েছিল। আমি বুঝেছিলাম, যদি মার খেতে হয়, তবে সেরা অভিনয়ের জন্যই মার খাব।”
ক্যারিয়ারের শুরুতে যে অপমান তাঁকে বাড়ি পর্যন্ত ফিরে যেতে দিত না, সেই অপমানই আজ তাঁর প্রেরণা। তিনি শুধু অভিনেতা নন-তিনি এমন এক উদাহরণ, যা দেখায় স্বপ্ন দেখে গেলে, কষ্ট এড়িয়ে গেলে নয়, কষ্টের ভেতর দিয়ে হাঁটলে তবেই সাফল্য আসে।