রুপালি ডেস্ক: ১৯৯২ সাল। মুক্তির অপেক্ষায় জসিম-শাবানা জুটির সুপারডুপার হিট ছবি “লক্ষীর সংসার।” ঠিক তার আগেই বাংলাদেশের অ্যাকশন লিজেন্ড জসিমকে নিয়ে মুখ খুলেছিলেন শাবানা। একটি সিনে ম্যাগাজিন দেওয়া সেই সাক্ষাৎকারে জসিমকে নিয়ে কি বলেছিলেন শাবানা? আজ এত বছর পর ফিরে দেখা সেই স্মৃতিচারণ, যা হয়তো আগে শোনেননি!
শাবানা ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী সুপারস্টার। তার নাম দেখলেই দর্শকরা হলে ছুটে যেতেন। এমন অসংখ্য সিনেমা আছে যেগুলোতে শাবানার বিপরীতে অনেক বড় তারকা থাকার পরেও প্রধান চরিত্র কিংবা নাম ভুমিকায় ছিলেন শাবানা। আর সেসব ছবি ছেলে-বুড়ো আবালবৃদ্ধবণিতা দেখার জন্য তুমুল আগ্রহে হলে ছুটতেন!
শাবানার বিপরীতে নায়ক হিসাবে বেশি দেখা গিয়েছে রাজ্জাক ও আলমগীরকে। আলমগীরের বিপরীতে সবচেয়ে বেশি ১৩০টি ছবিতে অভিনয় করেন শাবানা। জসিম-শাবানা জুটিও পেয়েছিল তুমুল জনপ্রিয়তা।
তবে চলচ্চিত্রে জসিমের পথ চলাটা মোটেও সহজ ছিল না। প্রথমে এক্সট্রা হিসাবে অভিনয়ের খাতায় নাম লেখান জসিম। এরপর খলনায়ক, তারপর নায়ক। জসিম-শাবানার রসায়ন একেবারেই অন্যরকম ছিল। জসিম অনেক পরিশ্রম এবং অভিনয়ে মুন্সিয়ানা দেখিয়েই ভক্তদের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন।

জসিমের সঙ্গে প্রথম অভিনয় এবং তার সাথে নানান স্মৃতির কথা শাবানা বলেছিলেন ১৯৯২ সালে “লক্ষ্মির সংসার” ছবি মুক্তির আগে। তখন চলচ্চিত্রের পত্রিকা বলতে পাঠকরা বুঝতেন চিত্রালী। সে সময় চিত্রালীকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জসিম সম্পর্কে শাবানা মজার কিছু ঘটনা শেয়ার করে বলেছিলেন,“ আজিমের পরিচালনার “উৎসর্গ” ছবির শুটিং হচ্ছিল এফডিসিতে। তখন নতুন ল্যাব বিল্ডিংয়ের জায়গটা ছিল জঙ্গল। মাঘ মাসে রাতের বেলা হাঁড়কাঁপানো শীত। পরিচালক আজিম আমাকে সিচুয়েশন বুঝিয়ে দিলেন। একজন গুন্ডা আমাকে কিডন্যাপ করে মুখ বেঁধে কাঁধে তুলে নিয়ে যাবে। শুটিংশুরু হলো। দেখলাম, একজন দাড়িওয়ালা কোকড়া চুলের একটু রাফ চেহারার মানুষ আমাকে কাঁধে তুলে নেয়ার জন্য প্রস্তুত হয়েছেন। পরিচালক অ্যাকশন বলার সাথে সাথে দাড়িওয়ালা মানুষটি আমাকে অবলীলায় কাঁধে তুলে নিলো। তারপর ছুটতে লাগলেন। শটটি শেষ হওয়ার পর ভদ্রলোক যখন কাঁধ থেকে নামালেন তখন তার অবস্থা দেখে আমি অবাক বিস্ময়ে চেয়ে দেখলাম বিরাটদেহী দাড়ি গোফওয়ালা ভদ্রলোক মাঘ মাসের শীতের রাতে দরদর করে ঘামছেন।”
শীতের রাতে কেন ঘামছিলেন জসিম? সে কথা মনে করিয়ে শাবানা বলেছিলেন,“ আমার মনে হয়নি তার হাঁটু শীতে কাঁপছে! ঘেমে নেয়ে একাকার জসিমকে দেখে মনে হচ্ছিল গোসল করেছেন। আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছিলাস তিনি যখন আমাকে কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তখন তার শরীর থেকে সেন্টের প্রচন্ড সুরভী নাকে এসে লাগছিল।”
এরপর হাসতে হাসতে শাবানা বলছিলেন,“ এই ভদ্রলোকই জসিম। নায়ক জসিম হয়ে আমার বিপরীতে অভিনয় করবেন আমিতো দূরের কথা জসিম নিজেও কোনদিন কল্পনা করেননি। ওটাই ছিল জসিমের সাথে আমার প্রথম শট।”

ওই ঘটনার অনেক বছর পর প্রথম দিনের ঘটনা নিয়ে জসিমকে জিজ্ঞেস করেছিলেন শাবানা। উত্তরে জসিম কি বলেছিলেন? শাবানা বলেন,“ এই ঘটনার পর জসিমকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম তার হাঁটু কাঁপা ও ঘেমে যাওয়ার বিষয় নিয়ে। জসিম বলেছিলেন,“ ওই কথা আর বলবেন না ম্যাডাম। আজিম ভাই যখন শুটিংয়ের দুদিন আগে আমাকে বললেন, শাবানাকে কাঁধে করে আমাকে ছুটতে হবে-তখন যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারিনি। শাবানার মতো একজন সুন্দরী নামী-দামী নায়িকাকে আমি কাঁধে নেব? উত্তেজনায় আমি শুটিংয়ের আগে থেকে আমি নার্ভাস ছিলাম। তারপর আপনাকে যখন সত্যি সত্যি কাঁধে তুলে নিয়ে ছুটছিলাম তখন আমি আর আমাতে ছিলাম না। প্রচন্ড নার্ভাস হয়ে ঘামছিলাম এবং হাঁটু দুটি ঠিক রাখতে পারিনি। ঠকঠক করে কাঁপছিল!”
জসিমের সাথে বিভিন্নরুপে রুপালি পর্দায় স্ক্রিন শেয়ার করেছেন শাবানা। তিনি বলেন,“ নায়ক হওয়ার আগে জসিম আমার সাথে ক্যামের সামনে এসেছেন ভয়ংকর ভিলেন হিসাবে, বৃদ্ধ পিতার ভুমিকায় আবার নায়ক হওয়ার পর কখনো ভাই, কখনো দেবর, কখনো স্বামী হয়ে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তিনি এগিয়ে গিয়েছেন।
সেই সাক্ষাৎকারে শাবানা এও বলেছিলেন সামান্য একজন এক্সট্রা অভিনেতা হিসাবে কিভাবে পরিশ্রম করে উঁচুতে উঠতে হয় সেটা দেখিয়েছেন জসিম। শাবানা বলেন,“ আসলে নিষ্ঠা ও পরিশ্রম গুনে জসিম একজন সামান্য অভিনেতা এবং ফাইট পরিচালক থেকে নামী নায়ক হতে পেরেছেন। জসিমের সবচেয়ে বড় গুন হলো তার বিনয়ী ব্যবহার ও বিস্ময়কর ধৈয্য। সত্যিকারের একজন ভদ্র মানুষ তিনি। আবার ভাগ্যবানও বলা যায়। জসিম শুরুতে অ্যাকশন হিরো হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। এরপর যখন আমাকে আর জসিমকে নিয়ে ভাই-বোনের চরিত্রে “সবুজ-সাথী” ছবিটি করা হলো, তখন আমার একটু দ্বিধা ছিল একেবারে দুখী অসহায় ভাইয়ের চরিত্রে নিটোল একটি সামাজিক চরিত্রে জসিমকে দর্শক গ্রহণ করবে কি না। আমি অনেককে বলেছিলাম এই ছবিটিতে যদি দর্শক জসিমকে গ্রহণ করে তাহলেই নায়ক হিসাবে তাকে আর কেউ আটকাতে পারবে না। “সবুজ সাথী”র বিরাট সাফল্যই প্রমাণ করেছে নায়ক জসিমের জনপ্রিয়তাকে।“
জসিমের যে ফিগার ছিল তাতে তার নায়ক হওয়ারই কথা নয়। সাক্ষাৎকারে শাবানা এ প্রসঙ্গে বলেন,“ শুরুতে জসিমের যে ফিগার ছিল তা নিয়ে নায়ক হিসাবে সফল হওয়ার ব্যাপারটা বিস্ময়কর ঘটনা। এই সাফল্যের পেছনে জসিমের শুধু ভাগ্যই ছিল না-কাজ করেছে তার অধ্যাবসায় এবং কাজের প্রতি আন্তরিকতা। সবার সাথে বন্ধুসুলভ সম্পর্ক, অগ্রজ শিল্পীদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং অনুজ শিল্পীদের প্রতি স্নেহ-পরায়নতা। জসিমের মতো এরকম বড় মনের মানসিকতা খুব কম শিল্পীর মধ্যেই দেখা যায়।”
১৯৯৮ সালের ৮ অক্টোবর বাংলার অ্যাকশন কিংবদন্তি সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। তার শূন্যতা আজও পূরণ হয়নি। এখনও তার অভাববোধ করে ঢালিউড। কোটি কোটি ভক্তের কাছে জসিম শুধু একজন নায়ক নন, তিনি এক আবেগের নাম, এক সোনালী অধ্যায়ের নাম।