হঠাৎ করেই কেন এই অবস্থা হলো জিৎ গাঙ্গুলির?

ফারহান তানভীর :

একটা সময় ছিল-যখন কলেজের ক্যান্টিনে, নোটবুকে, আর বন্ধুর ফোনে বাজতো -“লেডি কিলার রোমিও,লে পাগলু ড্যান্স,মালা রে,হামারি আধুরি কাহানি,খামোশিয়া,একটা প্রেমের গান লিখেছি”সহ আরো বাংলা কাঁপিয়ে তোলা গানগুলো।আর এই গানগুলোর পেছনে ছিলেন একজন মানুষ-জিৎ গাঙ্গুলি।যে মানুষটা সুরে সুরে প্রেম শেখাতো, বিচ্ছেদেও যেন শান্তি খুঁজে দিত। বাংলা সিনেমার সোনালি সময়ের এক অবিচ্ছেদ্য নাম ছিল তিনি।

ছবিতে জিৎ গাঙ্গুলি,টাইমস অফ ইন্ডিয়া থেকে নেয়া।

তখনই হঠাৎ বলিউডেও ঝড় তুললেন – আশিকি ২, হামারি অধুরি কাহানি, সিটি লাইটস… সেই সুরে ছিল ব্যথা, ভালোবাসা, আর সত্যি আবেগের ছোঁয়া। তবুও, জিত কখনও বাংলা গান থেকে দূরে যাননি।নিজের ভাষার গান, নিজের মাটির সুর – এটাই ছিল তার প্রাণের জায়গা।কিন্তু আজ, তিনি বসে আছেন একা।বলছেন, “আসলে আমি নিজেও ঠিক জানি না। প্রযোজক, পরিচালকরা কেন আর আমায় ডাকে না। অথচ আমি শুনেছি কিছুদিন আগেও অন্য একটি ছবির মিউজিক লঞ্চে আমার করা মিউজিক বেজেছে। টনিক ছবির মিউজিক করেছিলাম, তাও অনেকদিন হল। এখন এই স্বার্থপর ছবির সুর করার কাজ পেলাম। জানি না কেন আর ডাক পাই না।”

ছবিতে জিৎ গাঙ্গুলি,টাইমস অফ ইন্ডিয়া থেকে নেয়া।

তার কণ্ঠে অভিমান, কিন্তু গলায় ভাঙা নেই – আছে একরাশ প্রশ্ন।কেন এমন হলো?যে মানুষ একসময় রেকর্ডিং শেষ করে ছুটতেন এয়ারপোর্টে, সিডি হাতে প্লেনে উঠতেন-শুধু যেন বাংলা সিনেমার শুটে তার গান ঠিকমতো বাজে-সেই মানুষটাকেই আজ ভুলে গেছে তার নিজের ইন্ডাস্ট্রি।জিৎ বলেন, “আমার একসময় মুম্বইতে যখন খুব ব্যস্ততা ছিল, তখনও বাংলা সিনেমার জন্য সুর করেছি। রেকর্ডিং শেষ করে ছুটতে ছুটতে প্লেনে গান পাঠাতাম। আজকের সুপারস্টারদের সুপারহিট গান উপহার দিয়েছি। তবে এখন কেন ডাকে না ঠিক বলতে পারব না। আসলে আমি বাংলা গান করতে চাই, তাই মন খারাপ হয়।”

ছবিতে জিৎ গাঙ্গুলি,টাইমস অফ ইন্ডিয়া থেকে নেয়া।

তার চোখের ভাষায় বোঝা যায়, এটা শুধু কাজ না পাওয়ার হতাশা নয়-এটা এক ভালোবাসার হারানো ব্যথা।যে বাংলা তাকে গড়ে তুলেছিল, আজ সেই বাংলাই যেন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।হয়তো ইন্ডাস্ট্রির দৌড় এখন অন্য দিকে-রিমিক্স, র‍্যাপ, শর্ট রিলের ছন্দে হারিয়ে যাচ্ছে আসল সুরকারদের কণ্ঠ। কিন্তু সময়ের এই দ্রুত গতির ভেতরেও জিত এখনও সেই পুরনো সুরে বাঁচেন।সেই সুরে, যেখানে প্রেম মানে মায়া, গান মানে অনুভূতি।যেখানে একেকটা গিটার নোটে ছিল মানুষের নিজের জীবনের গল্প।যে সময়ে প্রেমপত্রের মতোই মূল্যবান ছিল একটা সিডি, আর রেডিওতে বাজা জিত গাঙ্গুলির নতুন গান মানে ছিল গানপ্রেমীদের সারাদিনের সবচেয়ে বড় সুখ।

ছবিতে জিৎ গাঙ্গুলি,টাইমস অফ ইন্ডিয়া থেকে নেয়া।

আজ তিনি নস্টালজিয়ায় ভেসে বলেন, “আমি বাংলা গান করতে চাই বলেই মন খারাপ হয়।”এই একটিমাত্র বাক্য যেন একটা প্রজন্মের হৃদয়ের কথা-যারা জিতের গানে প্রেমে পড়েছিল, বড় হয়েছিল, আবার কেঁদেছিলও।সময়ের স্রোত হয়তো অনেক কিছু বদলে দিয়েছে।তবু যারা একবার অন্তর দিয়ে জিৎ গাঙ্গুলির গান শুনেছে, তারা জানে-জিত গাঙ্গুলি শুধু একজন সুরকার নন, তিনি বাংলা গানের সেই আবেগ, যা একবার হৃদয়ে ঢুকলে সারাজীবন থেকে যায়।