স্পয়লার সহ মুভি রিভিউ-“রাক্ষস”

ফারহান তানভীর :

গত শনিবার শাকিব খানের প্রিন্স দেখে এসেই একটা স্পয়লার সহ রিভিউ লিখেছিলাম আপনাদের জন্য। আর এই শনিবার দেখে এলাম সিয়াম আহমেদের রাক্ষস।প্রিন্স দেখে যদি আমার টিকেটের ৭০ শতাংশ টাকা উঠে থাকে তাহলে রাক্ষস দেখে বাকি ১৩০% উঠে এসেছে।গত বছর বরবাদ আর এই বছর রাক্ষস দেখার পর মেহেদী হাসান হৃদয়ের উপর একটা বিশ্বাস না চাইতেও এসে গেছে যে এনার পরিচালিত সিনেমাগুলো দেখতে গেলে টিকেটের টাকা উসুল হবেই। একে তো ভায়োলেন্স থাকেই,তার মধ্যে বিজিএম,কোরিওগ্রাফি আর ডায়লগগুলো তো পুরো সাজানো প্যাকেজ।আর অবশ্যই শিল্পীদের কস্টিউমগুলোও থাকে একদম স্টাইলিশ এবং নজরকাড়া। হৃদয়ের ফ্যান হয়ে যাওয়ার বড় একটি কারণ এটি আমার জন্য।গতকাল রাক্ষস দেখে আসার পর থেকে নিজের মধ্যেই আলাদা একটা ভাব কাজ করছে।যাইহোক আবার সেই স্পয়লারযুক্ত রিভিউয়ে আসি।

গল্পের শুরুতেই দেখা যায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে ছাত্রদের মুখে মুখে শুধু একটিই নাম-রুশো স্যার। কিছুক্ষণ পরই দেখা যায়, এই রুশো স্যারই হলেন সিয়াম আহম্মেদ। একজন শিক্ষক হিসেবে রুশো অত্যন্ত কঠোর এবং নিয়মতান্ত্রিক-যার কারণে পুরো ক্যাম্পাসই তাকে ভয় পায়।আর পরের কিছু দৃশ্যে শিক্ষক হিসেবে রুশোর ব্যক্তিত্ব বুঝানোর জন্য কিছু গল্প শুনানো হয়।তবে গল্প সেখানে থেমে থাকে না। একই সময়ে দেখা যায়, রুশো স্যারই জেলে বন্দি। সেখানে কারাগারের ভেতরে চক দিয়ে দেয়ালে এঁকে এঁকে তিনি অন্যান্য কয়েদিদের বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান দিচ্ছেন। তার সাজা ছিল ছয় বছরের, কিন্তু মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে অধ্যক্ষ ও অন্যান্য প্রফেসররা উদ্যোগ নিয়ে তাকে জামিনে মুক্ত করে।রুশো চরিত্রটি ছিল মিশ্র একটি চরিত্র-যার মাঝে রাগী, স্টাইলিশ আবার ভেতরে ভেতরে আবেগপ্রবণ ভাব সবই আছে।

যাইহোক,জেল থেকে বের হয়ে তিনি আবার ভার্সিটিতে নিয়মিত ক্লাস নিতে শুরু করেন। আর সেখানেই পরিচয় হয় সিনেমার নায়িকা সুস্মিতা চ্যাটার্জি অর্থাৎ দিয়ার সঙ্গে। প্রথম দেখাতেই দিয়া রুশোর প্রেমে পড়ে যায় এবং ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।সম্পর্ক বেশ ভালোই চলছিল ওদের কিন্তু হঠাৎই সব এলোমেলো হয়ে যায়। এক রাতে রুশো দিয়াকে সারপ্রাইজ দিতে ফুল নিয়ে তার বাসায় যায়। দিয়া আগেই রুশোকে বলেছিল সে ঘুমাচ্ছে, কিন্তু বাসায় গিয়ে রুশো দেখে দিয়া নেই। পরে দিয়ার রুমমেটের থেকে জানতে পারে, দিয়া দুপুর থেকেই শায়ান নামের একজনের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে রুশো দিয়ার জন্য অপেক্ষা করে আর দিয়া ফিরে আসতেই তাকে চড়-থাপ্পড় মেরে সেখান থেকে চলে যায়।

পরদিন সকালে সংবাদমাধ্যমে জানা যায়, দিয়া গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। পুরো বিষয়টি রুশোর কাছে পরিষ্কার হয় যখন দিয়ার সেই বান্ধবী এসে আসল ঘটনা জানায়।শায়ান ছিল একটি রেড লাইট নেটওয়ার্কের মালিক, যার চরিত্রে অভিনয় করেছেন জনপ্রিয় অভিনেতা সোহেল মন্ডল। নারীদের প্রতি তার ছিল ভয়ঙ্কর আসক্তি। সে তার পছন্দের মেয়েদের জোর করে নিজের কাছে নিয়ে আসত আর তাদের শর্ত দিত- কোনো বিয়ে নয়, শুধু শারীরিক সম্পর্ক হবে তাদের এবং বিনিময়ে শায়ান তাদের যাবতীয় দায়িত্ব নেবে। শর্তে কেউ রাজি হলে বাঁচত, না হলে তার মৃত্যু।দিয়ার ক্ষেত্রেও একই প্রস্তাব দেওয়া হয়। বাঁচার জন্য দিয়া রাজি হয় এবং মিশিতে কিছুটা সময় লাগবে বলে শায়ানকে বিশ্বাস করায়। সেই সময়ের মধ্যেই রুশোর সঙ্গে দিয়ার পরিচয় হয়। পরবর্তীতে দিয়া ভাবে রুশোর সাথে ব্যাপারটা চিট করা হবে এবং তাই সে সাহস করে শায়ানের অফারকে ফিরিয়ে দেয় এবং প্রতিশোধ হিসেবে শায়ান ও তার লোকজন মিলে দিয়াকে নির্মমভাবে ধর্ষণ করে।

দিয়ার বান্ধবীর কাছে সবকিছু জানার পর রুশো হাসপাতালে গিয়ে দিয়ার কাছে প্রতিজ্ঞা করে-শায়ানকে হত্যা করে তার রক্ত দিয়ে গোসল করার পর আবার দিয়ার সামনে ফিরবে। এরপর একাই পরিকল্পনা করে শায়ানকে হত্যা করতে যায় এবং শেষ পর্যন্ত তাকে নির্মমভাবে মেরে ফেলে। ঠিক এই সময়েই আবির্ভাব ঘটে মেহেদী হাসান হৃদয়ের ইউনিভার্সের আইকনিক সেই চরিত্র-জিল্লুর। এবং এরপরই সিনেমা ইন্টারভ্যালে চলে যায়।

বিরতি শেষেই “বরবাদ” সিনেমার সংক্ষিপ্ত একটি ক্লিপ দেখানো হয়, যেখান থেকে জানা যায় বরবাদের আরিয়ান মির্জার বাবা আদিব মির্জা ছিলেন রুশোর বাবা শমশের শেখের বন্ধু। আর সেই শমশের শেখ চরিত্রে ছিলেন আলী রাজ। শায়ানের পরিবারের প্রতিশোধের আশঙ্কা থেকে ছেলের নিরাপত্তার জন্য শমশের শেখ আরিয়ান মির্জার পিএস জিল্লুকে রুশোর পিএস হিসেবে নিয়োগ দেন।এরই মাঝে রুশো ও দিয়া বিয়ে করে সংসার শুরু করে।

অন্যদিকে, শায়ানের আরও দুই ভাই ছিল-জায়ান ও আয়ান। শায়ানের মতোই তাদের চরিত্রও ছিল ভয়ঙ্কর-জায়ানের নেশা মানুষ হত্যা আর আয়ানের নেশা মাদক।বড় ভাই জায়ানের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ভারতীয় অভিনেতা শাতাফ ফিগার এবং ছোট ভাই আয়ানের চরিত্রে ছিলেন আবরার আতহার। তাদের দাদি তিন নাতিকেই অত্যন্ত ভালোবাসত। শায়ানের মৃত্যুর পর সেই দাদি তার দুই নাতিকে প্রতিশোধ নেওয়ার নির্দেশ দেয়।এরই ধারাবাহিকতায় আয়ান রুশোর বাড়িতে গিয়ে তার বাবা-মাকে হত্যা করে। রুশো ও দিয়া তখন বাড়ির বাইরে ছিল। ফিরে এসে রুশো মৃত বাবা-মাকে দেখে এবং সেখানেই আয়ানের সঙ্গে মুখোমুখি হয়। শেষ পর্যন্ত আয়ানকেও হত্যা করে রুশো এবং প্রতিজ্ঞা করে, জায়ানকে না মারা পর্যন্ত সে ঘুমাবে না।

আরেকদিকে রুশোর আপন চাচা ছিলেন শামীম। শামীম সবসময়ই চাইতো তার মেয়ের সঙ্গে রুশোর বিয়ে দিতে।কিন্তু রুশো যখন জানতে পারে তার মেয়ে অন্য একজনকে ভালোবাসে তখন সে কারো অনুমতি না নিয়েই ওদের দুজনের বিয়ে দিয়ে দেয় এবং এতে চাচার সাথে রুশোর সম্পর্ক খারাপ হয়। পরে ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে শামীম জায়ানদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রুশোর বাবা-মা’কে হত্যা করায়। সব সত্য জানার পর রুশো আয়ানের পরই নিজের চাচাকেও হত্যা করে।এরপর চূড়ান্ত লড়াইয়ে রুশো জায়ানকেও হত্যা করে। দুই নাতিকে মারার পর লাশ নিয়ে তাদের দাদির সামনে গিয়ে বলে,তোর সব নাতিরে খায়া দিছি।কখনো মন চাইলে আসিস আমারে খাইতে।

আমি ভেবেছিলাম গল্প হয়তোবা এখানেই শেষ। কিন্তু আসল টুইস্ট তখনো বাকি ছিল।রুশোর বিয়ের সময় তার মা বলেছিল, “নিশো থাকলে ভালো হতো।” কিন্তু শমশের শেখ তখনই তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে,খবরদার এই নাম নেবেনা। শেষ অংশে এসে অবশেষে প্রকাশ পায় সেই নিশোর পরিচয়-সে আর কেউ নয়, রুশোর যমজ ভাই এবং সেই চরিত্রেও অভিনয় করেছেন সিয়াম আহম্মেদ।রাক্ষসের ট্রেলারের শেষে যেই চরিত্র নিয়ে এতো কৌতুহল ছিল সবার,সেই চরিত্র আসলে নিশোর।

যাইহোক,নিশো এসে রুশোর স্ত্রী ও সন্তানকে হত্যা করে। ভাগ্যক্রমে রুশো বেঁচে যায়। এরপর দগ্ধ অবস্থায় চিকিৎসাধীন থেকে রুশো জিল্লুকে নির্দেশ দেয় সবকিছু প্রস্তুত করতে। শেষ দৃশ্যে দেখা যায়, জিল্লু জেল থেকে সেই কয়েদিদের বের করে আনছে-যাদের শুরুতেই রুশো অস্ত্র সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিচ্ছিল।আর গল্প শেষ হয় সেখানেই।

তারপরই আমার মনে প্রশ্ন জাগে-ভাইয়ের সঙ্গে ভাইয়ের শত্রুতা কেন?শায়ানের দাদি কি আবার প্রতিশোধ নেবে?রুশোর নতুন গঠিত দলের লক্ষ্যই বা কী? আশা করি মেহেদী হাসান হৃদয় খুব বেশি দেরি করাবেন না এসব কৌতুহল মেটাতে।তবে একটা বিদঘুটে ব্যাপার হলো,বরবাদ বলেন কিংবা রাক্ষস দুইটাতেই হৃদয়ের একটা ভুল চোখে লেগেছে।বরবাদে জিশু সেনগুপ্তকে যতটা বড় আকারে পরিচয় দেয়া হয়েছিল,বাস্তবে সে ততটা প্রভাব খাটাতে পারেনি।আবার রাক্ষসের বেলায় শাতাফ ফিগারকে আরও ভয়ংকর রুপে পাবো বলে ভেবেছিলাম।তাকেও তেমন একটা বড় প্রভাব ফেলতে দেখা যায়নি।আশা করি,সামনের সিনেমাগুলোতে এই দিকটায় নজর দেবেন হৃদয়।