জেসমিন জুঁই:
দিব্যা ভারতী। মাত্র ৩ বছরেই বলিউডে নিজের জায়গা পাকা করে ফেলেছিলেন। কিন্তু ১৯৯৩ সালের ৫ এপ্রিল মুম্বাইয়ের একটি পাঁচতলার বাসা থেকে পড়ে গিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান দিব্যা ভারতী। তার মৃত্যু আজও তার ভক্তদের কাছে রহস্যাবৃত হয়ে আছে! দিব্যা আত্মহত্যা করেছেন নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে এই প্রশ্ন আজও অনেকের মনে ঘুরপাক খায়!
আমরা আপনাদের জানাতে চলেছি ১৯৯৩ সালের ৫ এপ্রিল মৃত্যুর দিন দিব্যা কি করেছিলেন! তার পাঁচ তলার বাসায় সেদিন কে কে উপস্থিত ছিলেন? কেনইবা সেদিন তিনি বারবার রান্নাঘরে গৃহকর্মীর কাছে গিয়েছিলেন?
পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা রয়েছে যেগুলোর রহস্য হয়তো কোনদিনই ভেদ করা যাবে না, সেরকমই একটি ঘটনা বলিউড নায়িকা দিব্যা ভারতীর মৃত্যু। অভিষেকের তিন বছরে ১৪টি ছবি করে রেকর্ড গড়েন দিব্যা। আজ অবধি এই রেকর্ড অক্ষুন্ন রয়েছে। ১৯৭৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি মুম্বাইয়ে জন্মগ্রহণ করেন দিব্যা। বাবা বীমা কর্মকর্তা, মা ছিলেন গৃহিনী।

ছোটবেলা থেকেই ছিল দিব্যার নায়িকা হওয়ার বাসনা। পড়াশোনা তার ভালো লাগতো না। নবম শ্রেনীতে পড়ার সময়ই তার সেই বাসনা পূরণও হয়। পড়াশোনাকে ছুটি জানিয়ে দিব্যা হয়ে পড়েন পুরোদস্তুর অভিনেত্রী। তবে শুরুতে বলিউডে অভিনয় করার বাসনা দিব্যার পূরণ হয়নি। সুযোগ না পাওয়ায় তাঁকে অভিনয় করতে হয় দক্ষিণের তেলেগু ছবিতে। ১৯৯০ সালে ‘বাবলি রাজা’ ছবিতে মাত্র ১৬ বছর বয়সে অভিনয়ের হাতেখড়ি হয় দিব্যার। এই ছবিটি দারুণ ব্যবসা করেছিল। তারপর একের পর এক হিট ছবি উপহার দেন দিব্যা। তেলেগু ছবিতে দিব্যা এতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন যে, তার নামে সে সময় মন্দির উদ্বোধন করা হয়েছিল!
তেলেগু ছবির সাফল্যে দিব্যার বলিউডে সুযোগ করে নিতে বেগ পেতে হয়নি। ১৯৯২ সালে বিশাত্মা ছবি দিয়ে ছোটবেলার বলিউড নায়িকা হওয়ার বাসনা পূর্ণ করেন দিব্যা। প্রথম ছবি করেই আলোচনায় আসেন। এই ছবির ’সাতসমুদ্দুন পার মে তেরে’ গানটি দিয়ে বাজিমাত করেন দিব্যা। তার রুপ-লাবন্য এবং সহজ সরল সৌন্দর্য গোটা উপমহাদেশের দর্শকদের পাগল করে দিয়েছিল! সে সময় দোকানে দোকানে দিব্যার ভিউকার্ড বিক্রি হয়েছে দেদার।

এরপর শাহরুখ খানের বিপরীতে দিওয়ানা ছবিটি মুক্তি পেলে কেঁপে উঠে বলিউড! তখন অনেকেই বলাবলি করছিলেন, বলিউড আরেকজন শ্রীদেবী পেয়ে গিয়েছে! স্বয়ং দিব্যাও এই নিয়ে প্রশংসা শুনেছেন। এ নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে দিব্যা বলেছিলেন,“ আমি শ্রীদেবীর ভক্ত। যখন কেউ তার সঙ্গে আমার তুলনা করে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর হতে পারে না।”
১৯৯২ সালে শোলে অর শবনম ছবির সেটে দিব্যাকে প্রযোজক সাজিদ নাদিয়াওয়ালার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন নায়ক গোবিন্দ। এরপর দুজনের মন দেওয়া নেওয়া শুরু! দিব্যা সাজিদকে এতটা ভালোবেসেছিলেন যে, তাকে বিয়ে করার জন্য ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। এরপর দিব্যা ভারতী নাম বদলে হয়ে যানা সানা নাদিয়াওয়ালা।
দূর্ভাগ্য দিব্যা-সাজিদের! দাম্পত্য জীবনের ১০ মাস পেরোতে না পেরোতেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান দিব্যা। দিনটি ছিল ১৯৯৩ সালের ৫ এপ্রিল। কি ঘটেছিল সেদিন?
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, মৃত্যুর দিন হায়দরাবাদে শুটিং করছিলেন দিব্যা। শুটিং করতে গিয়ে পায়ে চোট পান। এরপর ফিরে আসেন মুম্বাইয়ের বাসায়। সেদিনই মুম্বাইয়ের অভিজাত এলাকায় একটি বাড়ি কেনেন দিব্যা। তার চুক্তি তিনি ওই দিনই স্বাক্ষর করেন। এ খবরটি শুধু দিব্যার ভাই কুনাল ছাড়া আর কেউ জানতেন না।

সেই সময় দিব্যার প্রতিবেশিরা জানিয়েছিলেন, রাত দশটার দিকে প্রিয় বন্ধু এবং ডিজাইনার নীতা লুললা স্বামীসহ দিব্যার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। পরবর্তীতে নীতার কথায় জানা যায়, আগামী ছবির জন্য দিব্যার জামার ডিজাইন নিয়ে এসেছিলেন তিনি। বাসায় নীতার সঙ্গে হাসিঠাট্টা করার পাশাপাশি মদ পানও করছিলেন দিব্যা।
৫ এপ্রিলের ওই রাতে নীতা ও তার স্বামী, দিব্যা এবং গৃহকর্মী অমৃতা ছাড়া আর কেউ বাসায় ছিলেন না। অমৃতা গৃহকর্মী হলে কি হবে তিনি ছিলেন দিব্যার খুব কাছের মানুষ। জন্মের পর অমৃতার হাতেই দিব্যা মানুষ হয়েছেন। দিব্যা যখন একা থাকা শুরু করেন তখন অমৃতাও তার সাথে থাকা শুরু করেন।
রাতে দিব্যা ও নীতা আড্ডা দিতে দিতে সময় গড়িয়ে যায়। গৃহকর্মী অমৃতা রান্নাঘরে ঢুকে যান খাবার তৈরি করার জন্য। নীতা ও তার স্বামী টিভি দেখায় মত্ত ছিলেন! এমন সময় রুম থেকে বেরিয়ে ব্যালকনিতে চলে যান দিব্যা। ব্যালকনিতে সুরক্ষার জন্য কোন ধরণের গ্রিল লাগানো ছিল না। ব্যালকনির ঠিক নিচেই ছিল গাড়ি পার্কিং করার জায়গা। অন্যান্য দিন গাড়ি পার্ক করা থাকলেও সেদিন কোন এক কারণে গাড়ি পার্ক করা ছিল না। সেদিন বাড়িতে দিব্যার স্বামী সাজিদের থাকারও কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রতিবেশিরা রুমের ভিতর দিব্যাকে কথা বলতে শুনেছিলেন।

দিব্যার মৃত্যু নিয়ে নীতা বলেছিলেন, গৃহকর্মী অমৃতাকে দিব্যা দূর থেকে নির্দেশ দিচ্ছিলেন। ব্যালকনিতে নেশাগ্রস্থ অবস্থায় দিব্যা দাঁড়িয়েছিলেন। পায়ে চোট লাগার কারণে পা পিছলে গিয়ে নিজেকে সামলাতে পারেননি দিব্যা। ব্যালান্স হারিয়ে পাঁচতলার ব্যালকনি থেকে পড়ে যান মাটিতে। নিচে নামতে নামতেই অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। তখনও বেঁচেছিলেন দিব্যা। কিন্তু কুপার হাসপাতালে যাওয়ার পথেই মারা যান তিনি।
দিব্যার মৃত্যুর বহুদিনবাদে অর্থাৎ ২০০০ সালে সাংবাদিক ওয়ার্ধাকে বিয়ে করেন সাজিদ নাদিয়াওয়ালা। তাদের ঘরে রয়েছে দুই সন্তান। ওয়ার্ধা তাদের বিবাহবার্ষিকীতে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন,“ আজও আমার এবং সাজিদের রুমে বড় করে দিব্যার ছবি টানানো রয়েছে। আমি বুঝতে পারি সাজিদের কতখানিজুড়ে দিব্যা আজও আছে! আমি এ নিয়ে সাজিদকে কোন কিছু বলি না। আমার সন্তানরা দিব্যাকে বড় মা বলে ডাকেন। প্রায়ই সন্তানরা তার বাবার নিকট বড় মা’র গল্প শুনতে চায়। দিব্যা মেয়েটি বড্ড অবেলায় চলে গিয়েছে।”

দিব্যার মৃত্যুর পর বহু খবর বের হয়েছিল সংবাদমাধ্যমে। কিন্তু দিব্যার মৃত্যু রহস্যের জট আর খোলেনি। অভিযোগ উঠেছিল পাঁচতলা থেকে দিব্যাকে নাকি ধাক্কা মেরে ফেলা দেয়া হয়েছিল! এখানেই শেষ নয়, দিব্যার মৃত্যুর সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সংশ্লিষ্টতার কথাও বলা হয়েছে। সন্দেহের তালিকায় ছিলেন তার স্বামী সাজিদ নাদিয়াওয়ালা।
এমনও ধারণা করা হয়েছিল দিব্যার মৃত্যুতে হাত ছিল আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন দাউদ ইব্রাহিমের। মুম্বাই পুলিশ দীর্ঘ পাঁচ বছর তদন্ত চালিয়েও কোন প্রমাণ খুঁজে পাননি। ফলে ১৯৯৮ সালে বন্ধ হয়ে যায় দিব্যা হত্যার তদন্ত। শেষ পর্যন্ত পুলিশের খাতায় লেখা হয়ে যায় দিব্যার মৃত্যু একটি দূর্ঘটনা।
অবেলায় যদি না চলে যেতেন তাহলে দিব্যার সঙ্গে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পড়তে হতো শ্রীদেবী, জুহি চাওলা ও মাধুরীকে।