মুভি রিভিউ-“প্রিন্স:ওয়ান্স আপওন এ টাইম ইন ঢাকা”

মেহেদী হাসান :

আজকে আমি যে সিনেমাটি নিয়ে লিখতে যাচ্ছি, সেটির নাম “প্রিন্স: ওয়ান্স আপন এ টাইম ইন ঢাকা”। শাকিব খান অভিনীত এই সিনেমাটি মুক্তির আগেই আমাদের মনে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি করলেও মুক্তির পর সেই প্রত্যাশার পুরোটা পূরণ করতে পারেনি। মুক্তির প্রথম দিন থেকেই এত নেতিবাচক রিভিউ ছড়িয়ে পড়ে যে, আমি নিজেও টাকা দিয়ে টিকিট কেটে হলে গিয়ে দেখার সাহস পাচ্ছিলাম না। তবুও শেষ পর্যন্ত একপ্রকার “টাকা পানিতে ফেলার” মানসিকতা নিয়েই সিনেমাটি দেখতে গিয়েছিলাম। তবে সত্যি বলতে পুরো সিনেমা দেখার পর আমার মনে হয়েছে-মানুষ যতটা খারাপ বলছে, ততটা খারাপ না। পুরোপুরি না হলেও, অন্তত টিকিটের ৭০% টাকা আমার উসুল হয়েছে।

যেহেতু এই সিনেমাকে ঘিরে নেতিবাচক রিভিউই বেশি, তাই সেগুলো দিয়েই শুরু করা যাক। আমার কাছে সিনেমাটির সবচেয়ে দুর্বল দিক লেগেছে এর গ্রাফিক্স এবং ভিএফএক্স। কিছু কিছু জায়গায় এতটাই খাপছাড়া মনে হয়েছে যে, এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছে আমি যেন ৯০-এর দশকের কোনো সিনেমা দেখছি। এছাড়া মেইন ভিলেন হিসেবে দিব্যেন্দু ভট্টাচার্যের অভিনীত আফগানি পাঠান চরিত্রটিও সেভাবে ফুটে উঠতে পারেনি। বেশ কিছু জায়গায় মনে হয়েছে, ভিলেনের চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরী বা মিশা সওদাগরের মতো কাউকে নিলে হয়তো আরও শক্তিশালী লাগত। সিনেমাটির আরেকটি ভুল দিক হলো- বিভিন্ন জায়গাকে ঢাকার জায়গা হিসেবে দেখানো হলেও, সেগুলোর বেশিরভাগ শুটিং হয়েছে ভারতে। তবে আপনাদের কাছে থেকে সবচেয়ে বড় অভিযোগ এসেছে-গল্পের আগা-মাথা নেই। আমিও আপনাদের সাথে বলছি, গল্পটা সত্যই কিছুটা এলোমেলোভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তবে শুরু থেকে মনোযোগ দিয়ে দেখলে একেবারে দুর্বোধ্যও মনে হবে না।

সে যাই হোক,এবার সিনেমার গল্পে আসি । সিনেমার শুরুতেই দেখা যায় তাসনিয়া ফারিন তথা দিলরুবা একটি শুটিংয়ে ব্যস্ত। শুটিং চলাকালীন হঠাৎ একটি ফোনকল পেয়ে সে দ্রুত সেখান থেকে বের হয়ে যায় এবং সীমান্তের কাছে গিয়ে কয়েকটি তার কেটে দেয়। কিছুক্ষণ পর সেখানে কালো কোট-প্যান্ট পরা একজন ব্যক্তি আসে এবং দিলরুবার সঙ্গে গাড়িতে উঠে যায়। অন্যদিকে, সেই ব্যক্তিকে “বোয়াল মাছ” হিসেবে উল্লেখ করে মেইন ভিলেন আফগানি পাঠানকে জানানো হয় যে সে এসে গেছে এবং পাঠান তাকে কোনোভাবেই বাঁচতে না দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এরপর দেখা যায়, সেই কালো পোশাকধারী ব্যক্তি তার গ্যাং নিয়ে একটি সন্ত্রাসী মিটিংয়ে আক্রমণ চালায় এবং তখনই প্রকাশ পায় যে সে আসলে সিনেমার নায়ক শাকিব খান অর্থাৎ প্রিন্স। এদিকে সেই সময় স্পেশাল ফোর্সও (এসএফ) এসে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে, যার নেতৃত্বে ছিল ইনতেখাব দিনার তথা অফিসার মিনহাজ। ঘটনাস্থল থেকে প্রিন্স পালাতে সক্ষম হলেও তার দলের ভুট্টু নামে একজন ধরা পড়ে। এসএফ কাস্টডিতে নিয়ে ভুট্টুকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং তার মুখ থেকেই সিনেমার পুরো গল্পটি সামনের দিকে আগায়।

তখনো শাকিব খান “প্রিন্স” হননি, তার নাম ছিল ইব্রাহীম। ঢাকায় আসার পথে ট্রেনে ভুট্টুর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। আশ্রয়ের অভাবের কথা শুনে ভুট্টু তাকে নিয়ে যায় তার ওস্তাদ ঘাওড়া বাবুর কাছে। ঘাওড়া বাবুর বোনই ছিল দিলরুবা। দিলরুবা পেশায় একজন বার ড্যান্সার এবং সেই সুবাদে ইব্রাহীমকেও বারে একটি কাজ জোগাড় করে দেয়। একদিন বারে নাচ চলাকালীন একজন ছেলে দিলরুবাকে উত্যক্ত করলে ইব্রাহীম নিজেকে সামলাতে না পেরে তাকে মারধর করে। পরে জানা যায়, ওই ছেলেটি রাশেদ কমিশনারের ছেলে মাসুম। এই ঘটনার জেরে কমিশনার নিজে থানায় গিয়ে ইব্রাহীমকে মারধর করে এবং যাবৎ জীবনের জন্য জেলে পাঠানোর ব্যবস্থা করে।সেই জেলে গিয়েই ইব্রাহীমের পরিচয় হয় পুরান ঢাকার প্রভাবশালী গ্যাংস্টার গোপাল করের সঙ্গে। গোপাল ইব্রাহীমের যাবতীয় কথা শুনে তার জামিনের ব্যবস্থা করে এবং শর্ত দেয়-তার লুকিয়ে রাখা দুটি পিস্তল উদ্ধার করে রাখতে হবে। জেল থেকে বের হয়ে ইব্রাহীম পিস্তল উদ্ধার করলেও সরাসরি গোপালের কাছে দিতে পারেনি। কারণ তার আগেই সেই পিস্তলকে কেন্দ্র করে কমিশনারের ছেলে রাশেদ, ঘাওড়া বাবুর সাথে মারপিট করে এবং বাবুকে হত্যা করে পিস্তল নিয়ে যায়।

এরপর গোপাল জেল থেকে বের হয়ে এলে ইব্রাহীম তার দলে যোগ দেয়। কিছুদিন পর মাসুমকে মেরে পিস্তল উদ্ধার করে।প্রশাসনিক চাপ থেকে দূরে রাখতে গোপাল ইব্রাহীমকে অন্য জায়গায় রাখে এবং ধীরে ধীরে প্রশিক্ষ্ণ দিয়ে ইব্রাহীমকে গড়ে তোলে। সে সময় ঢাকার সবচেয়ে বড় ডন ছিল আফগানি পাঠান। এক অভিযানে ইব্রাহীম আফগানি পাঠানের জীবন বাঁচায় এবং পাঠান তার সাহস ও ব্যক্তিত্ব দেখে তাকে “প্রিন্স” নাম দেয়।এরপর ইব্রাহীম আলাদা একটি বাসায় থাকতে শুরু করে এবং বাসার মালিকের মেয়ে সোনিয়ার সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে, পরে তারা বিয়েও করে। এদিকে পাঠানের হয়ে বিভিন্ন কাজ করে গোপাল নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা পেত এবং সেই টাকাতেই তার গ্যাং চালাতো। কিন্তু একসময় ইব্রাহীম বুঝতে পারে, শুধু টাকার ভাগে বড় হওয়া সম্ভব নয়। সে গোপালকে বলে, এখন সময় এসেছে টাকার ভাগ নয়, এলাকার দখল নেওয়ার। ইব্রাহীমের কথায় গোপাল পাঠানের কাছে গিয়ে নির্দিষ্ট একটি অঞ্চল দাবি করে কিন্তু পাঠান তাতে সরাসরি না করে এবং তাচ্ছিল্যের সঙ্গে গোপালকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়।অপমানের বদলা নিতে এরপর গোপালের সহায়তায় ইব্রাহীম “ব্ল্যাক ভাইপার” নামে একটি গ্যাং গড়ে তোলে এবং পাঠানের বিভিন্ন জায়গায় আক্রমণ চালাতে শুরু করে। পরিস্থিতি যখন চরমে পৌঁছে গেলে পাঠান সমঝোতার প্রস্তাব দিয়ে গোপালকে তার লোকজনসহ ডেকে পাঠায়। ব্যক্তিগত কারণে প্রিন্স সেখানে পৌঁছাতে দেরি করে আর গোপাল আগেই পৌঁছে যায়। পাঠানের আস্তানায় পৌঁছানো মাত্র গোপাল এবং তার লোকজনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এমনকি গোপালের ছেলেকেও মেরে ফেলা হয়। রাতে প্রিন্স সব জানতে পেরে গোপালের বাড়িতে যায় এবং চারপাশে শোকাবহ পরিবেশ দেখতে পায়। আর ঠিক এখানেই ছবির অর্ধেক অংশ শেষ হয়ে যায়।

সিনেমার প্রথম অংশ পর্যন্ত গল্পটি বেশ গোছানো মনে হলেও, ইন্টারভ্যালের পর থেকেই কিছুটা গোঁজামিল শুরু হয়। অনেক দর্শক যে গল্পের আগা-মাথা খুঁজে পাননি, আমার মনে হয় তার পেছনে বড় কারণ এই দ্বিতীয় অংশ। তবে শুরুতেই আমি যেহেতু বলেছি, মনোযোগ দিয়ে দেখলে পুরোটা বোঝা অসম্ভব নয়-সেই চেষ্টাই এখন আমি করবো যেন আপনাদের কাছে গোজামিল না লাগে।

দ্বিতীয় অংশের শুরুতে দেখা যায়,গোপালের মৃত্যুর পর প্রিন্স নিজেই পাঠানের উপর আক্রমণ চালায়। পরে আশুরার দিনে পাঠান প্রিন্সকে সমঝোতার জন্য ডাকে। আগের মতোই ফাঁদের কথা ভেবে প্রিন্স একাই সেখানে যায় এবং সিনেমার সবচেয়ে আলোচিত সেই মেশিনগান ব্যবহার করে পাঠানের প্রায় সব লোকজনকে হত্যা করে। এরপর গোপাল ও তার ছেলেকে হত্যার অভিযোগে পাঠানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।এদিকে প্রিন্সের পরিচয় হয় একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান চৌধুরী আজাদ ফেরদৌসের সঙ্গে। আজাদ ফেরদৌসের এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন ড. এজাজ আহমেদ। আজাদ ফেরদৌসের সঙ্গে প্রিন্সের এমন চুক্তি হয় যে প্রিন্স তাকে নির্বাচনে জিততে সাহায্য করবে আর বিনিময়ে আগামী পাঁচ বছর প্রিন্সের নামে কোনো মামলা কার্যকর হবে না, সে যত বড় অপরাধই করুক না কেন।

নির্বাচনের দিন আসলো এবং প্রিন্সের সহায়তায় আজাদ জয়লাভও করলো। নির্বাচনের পর এলাকার কমিশনারের লোকজনদের সঙ্গে চাঁদা তোলা নিয়ে প্রিন্সের লোকদের সংঘর্ষ শুরু হয়। এই অভিযোগ নিয়ে প্রিন্স যখন আজাদের কাছে যায়, তখন গিয়ে দেখে সেখানে রাশেদ কমিশনার ও পাঠানও উপস্থিত। তখন সে বুঝতে পারে তার পুরনো শত্রুরা একত্রিত হয়ে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে।এই ঘটনার কারণে প্রিন্স নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং তার লোকজন দিয়ে এলাকায় একের পর এক কমিশনারকে হত্যা করায়। আর এই হামলায় রাশেদ কমিশনারও নিহত হয়। এই ঘটনার পর অবশেষে স্পেশাল ফোর্স অভিযান চালিয়ে প্রিন্সকে গ্রেপ্তার করে এবং এই অভিযানের দায়িত্বেও ছিলেন অফিসার মিনহাজ।

প্রিন্সকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময় উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ মিনহাজকে নির্দেশ দেয়-এমন আসামিকে আইনের আওতায় এনে লাভ নেই বরং এনকাউন্টার করে ফেলাই ভালো। কর্মকর্তার কথা শুনে মিনহাজ তাকে এনকাউন্টারের জন্য নিয়ে যায় ঠিকই কিন্তু শেষ পর্যন্ত এনকাউন্টার না করে উল্টো তাকে ছেড়ে দেয়। পরে জানা যায়, মিনহাজের এই কাজ করার পেছনে ছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আজাদের নির্দেশ। বাইরে থেকে আজাদ প্রিন্সের বিরোধিতা করলেও, ভেতরে ভেতরে সে যে প্রিন্সের পক্ষেই ছিল তা বোঝা যায় এই দৃশ্যে এসে। এভাবেই সেবার এনকাউন্টারের হাত থেকে বেঁচে যায় প্রিন্স, যদিও সবাই ধরে নেয় সে মারা গেছে।আমি ভেবেছিলাম সিনেমা এখানেই শেষ কিন্তু পরে দেখি-ইব্রাহীমের মতো দেখতে একজন ব্যক্তি রাজস্থানের মরুভূমিতে তামিল নায়কদের মতো সাদা শার্ট আর ধুতি পড়ে মারপিট করছে। আর এই দৃশ্য দেখে আমিও কনফিউজ হয়ে গিয়েছি যে – এটাই কি প্রিন্স, নাকি সম্পূর্ণ নতুন কোনো চরিত্র? এই ব্যাপারটা অবশ্য রহস্য হিসেবে রেখেই সিনেমার সমাপ্তি ঘটে, যা থেকে আমার মনে হয়-সম্ভবত ভবিষ্যতে “প্রিন্স ২” আসতে পারে।

বিরতির পরের অংশে কিছু গোজামিল থাকলেও, আমি চেষ্টা করেছি গল্পটি যতটা সম্ভব সহজভাবে তুলে ধরার। এই রিভিউ পড়ার পর যদি আপনারা হলে গিয়ে সিনেমাটি দেখেন, তাহলে হয়তো আরও পরিষ্কারভাবে সবকিছু আপনারা বুঝতে পারবেন। আর যদি না-ও দেখেন, তবুও বলতে পারি-সিনেমাটি সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা আপনাদের তৈরি হয়েছে।