বলিউডের শাহেনশাহ আজ ৮৩-তে: অমিতাভ বচ্চনের অনবদ্য জীবনকথা…

ফারহান তানভীর :

বলিউডের ইতিহাস যখনই আলোচনায় আসে, তখনই এক নাম অনিবার্যভাবে জ্বলে ওঠে-অমিতাভ বচ্চন। তিনি শুধু একজন অভিনেতা নন, তিনি এক যুগ, এক প্রতিষ্ঠান, এক অনুপ্রেরণার নাম। ১৯৪২ সালের ১১ অক্টোবর উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদে জন্মগ্রহণ করেন এই কিংবদন্তি। তাঁর বাবা হরিবংশ রায় বচ্চন ছিলেন খ্যাতনামা হিন্দি কবি এবং মা তেজী বচ্চন ছিলেন পাঞ্জাবি বংশোদ্ভূত গৃহিণী। ছোটবেলা থেকেই অমিতাভ ছিলেন মেধাবী ও আত্মপ্রত্যয়ী। তিনি পড়াশোনা করেছেন শেরউড কলেজ এবং পরে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিরোরি মাল কলেজে। প্রথম জীবনে তিনি চেয়েছিলেন ইঞ্জিনিয়ার হতে বা বিমান বাহিনীতে যোগ দিতে, কিন্তু ভাগ্যের ছকে লেখা ছিল অন্য কিছু-ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক মহাকাব্যিক অধ্যায় রচনার নিয়তি।

অমিতাভ বচ্চন। ছবি – বলিউড হাঙ্গামা

সত্তরের দশকের শুরুতে বলিউড তখন মূলত রোমান্টিক নায়কদের দখলে। সেই সময় ‘সাত হিন্দুস্তানি’ (১৯৬৯) ছবির মাধ্যমে পর্দায় আসেন লম্বা, গম্ভীর কণ্ঠের এক তরুণ-অমিতাভ বচ্চন। ছবিটি তেমন সফল না হলেও তাঁর উপস্থিতি নজর কাড়ে। এরপর ‘আনন্দ’ ছবিতে রাজেশ খান্নার সঙ্গে তাঁর অভিনয় প্রশংসা কুড়ায়। কিন্তু আসল সাফল্য আসে ১৯৭৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘জঞ্জির’ ছবির মাধ্যমে। এই ছবিতেই তিনি পান “অ্যাংরি ইয়ং ম্যান” উপাধি, যা পরে তাঁর পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। পরপর ‘দিওয়ার’, ‘শোলে’, ‘কুলী’, ‘অমর আকবর অ্যান্থনি’, ‘ত্রিশূল’, ‘ডন’-একটির পর একটি হিট ছবি তাঁকে বলিউডের রাজাসনে বসায়। তাঁর কণ্ঠস্বর, সংলাপ উচ্চারণ, এবং পর্দায় উপস্থিতি দর্শকের মনে এক অদম্য শক্তির প্রতীক হয়ে ওঠে।

অমিতাভ বচ্চনের একাল – সেকাল। ছবি – কোলাজ

অমিতাভ বচ্চনের জীবনে যেমন সাফল্যের উজ্জ্বল অধ্যায় আছে, তেমনি আছে ভয়াবহ পতনের সময়ও। ১৯৮২ সালে ‘কুলি’ ছবির শুটিংয়ের সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন তিনি। মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ফিরে আসেন জীবনে-যা তাঁকে মানুষের চোখে আরও মহৎ করে তোলে। পরে নব্বইয়ের দশকে এসে তাঁর ক্যারিয়ার কিছুটা ম্লান হয়ে পড়ে। প্রযোজনায় নামেন, কিন্তু ‘এবিসিএল’ প্রোডাকশন হাউজের ব্যর্থতায় আর্থিকভাবে মারাত্মক সংকটে পড়েন। সেই সময় অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো অমিতাভ বচ্চনের যুগ শেষ। কিন্তু তিনি ছিলেন অমিতাভ-যিনি পতন থেকে আবার উঠে দাঁড়াতে জানেন।১৯৯৯ সালে ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’ শো-এর মাধ্যমে তিনি টেলিভিশনে ফিরে আসেন এক নতুন রূপে। তাঁর গম্ভীর কণ্ঠ, স্নিগ্ধ উপস্থাপনা ও আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তিত্ব আবারও তাঁকে কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে দেয়। পরবর্তীতে ‘মোহাব্বতেঁ’, ‘বাগবান’, ‘ব্ল্যাক’, ‘পা’, ‘পিৎজা’, ‘পিকু’, ‘থ্রি’ বা ‘গুডবাই’-সব ছবি তাঁকে প্রমাণ করেছে সময়ের সীমানা পেরিয়ে যাওয়া এক শিল্পী হিসেবে। তিনি এমন এক অভিনেতা যিনি নিজেকে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন করতে জানেন, যিনি তরুণদের মতোই উদ্যমী এবং সিনিয়রদের মতোই প্রাজ্ঞ।অমিতাভ বচ্চনের ব্যক্তিগত জীবনও বলিউড ইতিহাসের অংশ।

এংরি ইয়ং ম্যান অমিতাভ বচ্চন। ছবি – ইন্ডিয়া ফোরামস

১৯৭৩ সালে তিনি বিবাহ করেন অভিনেত্রী জয়া ভাদুরিকে। এই দম্পতি আজও বলিউডের অন্যতম আদর্শ দম্পতি হিসেবে পরিচিত। তাঁদের দুই সন্তান-অভিষেক বচ্চন ও শ্বেতা বচ্চন। পুত্র অভিষেকও বলিউডে অভিনেতা হিসেবে কাজ করছেন, আর পুত্রবধূ ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন নিজেও এক সময়ের বিশ্বসুন্দরী ও জনপ্রিয় অভিনেত্রী। বচ্চন পরিবার আজও ভারতের সবচেয়ে সম্মানিত চলচ্চিত্র পরিবারগুলোর একটি।

ছেলে,মেয়ে,স্ত্রীসহ অমিতাভ বচ্চন। ছবি – ইন্ডিয়া টুডে

অমিতাভ বচ্চন শুধু একজন অভিনেতা নন, তিনি ভারতের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক। তিনি রাষ্ট্রীয় পুরস্কার, পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ ও পদ্মবিভূষণসহ অসংখ্য সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ও ব্যক্তিত্বের স্বীকৃতি এসেছে বহুবার। বয়স আশির কোঠায় পৌঁছে গেলেও আজও তিনি সমান উদ্যমে কাজ করছেন। তাঁর উপস্থিতি মানেই দর্শকের কৌতূহল, তাঁর নতুন সিনেমা মানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

দুইকালের অমিতাভ বচ্চন। ছবি – কোলাজ

একজন মানুষ, যিনি জীবনভর সংগ্রাম করে গড়ে তুলেছেন নিজের সাম্রাজ্য, যিনি ব্যর্থতাকে সোপান বানিয়েছেন নতুন সাফল্যের, যিনি নিজের কণ্ঠে, দৃষ্টিতে, চলনে এক যুগের প্রতীক হয়ে উঠেছেন-তিনি অমিতাভ বচ্চন। তাঁর জীবন কেবল এক অভিনেতার গল্প নয়, এটি এক অনুপ্রেরণার ইতিহাস। জন্মদিনে তাই তাঁকে বলা যায়-অমিতাভ বচ্চন কেবল বলিউডের নয়, পুরো ভারতীয় সংস্কৃতির এক অবিনশ্বর নক্ষত্র, যার আলো সময়ের পর সময় ধরে প্রজন্মকে পথ দেখাবে।