মেহেদী হাসান :
আজকের দিনে বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের জীবন্ত কিংবদন্তি, আমাদের গর্ব ও প্রজন্মের প্রেরণা জেমসের জন্মদিন। তাঁর আসল নাম ফারুক মাহফুজ আনাম হলেও তিনি জেমস নামেই পরিচিত, আর ভক্তদের কাছে তিনি ‘গুরু’ হিসেবেই সর্বাধিক সমাদৃত। ১৯৬৪ সালের ২ অক্টোবর নওগাঁ জেলায় জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে চট্টগ্রামে, যেখানে ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতের প্রতি তাঁর গভীর টান তৈরি হয়।

বিদেশি রক ব্যান্ডের গান শুনতে শুনতে তিনি গিটার হাতে নেন এবং সঙ্গীতজগতে ঝাঁপিয়ে পড়েন, যদিও পরিবার প্রথমে এই পথকে সহজভাবে নেয়নি। জেমস খুব অল্প বয়সেই বাড়ি ছেড়ে ছাত্রাবাসে থাকতে শুরু করেন এবং নিজের ভেতরের শিল্পীসত্তাকে বাঁচিয়ে রাখেন। সত্তরের দশকের শেষ দিকে তিনি “ফিলিংস” নামে একটি ব্যান্ড গঠন করেন, যা পরে “নগর বাউল” নামে পরিচিতি পায় এবং এই নামের সঙ্গেই জেমস বাংলাদেশের রক সঙ্গীতকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেন।

নব্বইয়ের দশকে যখন ব্যান্ডসংগীত তরুণদের কাছে নেশার মতো জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তখন ফিলিংস তথা নগর বাউল ছিল সেই বিপ্লবের অন্যতম চালিকাশক্তি। জেমসের গলা, তাঁর ভিন্নধর্মী স্টেজ পারফরম্যান্স এবং গানের কথার গভীরতা শ্রোতাদের হৃদয়ে অন্যরকম আবেগ তৈরি করেছে। তাঁর প্রথম অ্যালবাম ‘স্টেশন রোড’ হয়তো তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি, কিন্তু পরবর্তী অ্যালবাম ‘জেল থেকে বলছি’ তাঁকে স্থায়ীভাবে পরিচিতি এনে দেয়। এরপর ‘অনন্যা’, ‘পালাবে কোথায়’, ‘দুঃখিনি দুঃখ করোনা’, ‘ঠিক আছে বন্ধু’ একের পর এক অ্যালবাম প্রকাশ করে তিনি নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করেন।

গানের মধ্যে তিনি কখনো প্রেম, কখনো বেদনা, কখনো সমাজবাস্তবতা, আবার কখনো আধ্যাত্মিকতার সুর তুলে ধরেছেন, যা তাঁর শ্রোতাদের মনের সঙ্গে মিশে গেছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, ভারতে হিন্দি সিনেমার গান গেয়েও তিনি আলোচনায় আসেন। ২০০৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বলিউড সিনেমা ‘গ্যাংস্টার’-এ তাঁর গাওয়া ‘ভিগি ভিগি’ গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়, এরপর ‘ওহ লমহে’, ‘লাইফ ইন এ মেট্রো’সহ একাধিক ছবির জন্য গান করেন। দেশের চলচ্চিত্রেও তিনি সমানভাবে সফল, ‘দেশা: দ্য লিডার’ এবং ‘স্বত্তা’ ছবির জন্য সেরা প্লেব্যাক সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেছেন। জেমসের গাওয়া ‘তোকে ভেবে দেখা যায় না’ কিংবা ‘তোর প্রেমেতে’ এখনো কোটি ভক্তের মনে জায়গা করে আছে।

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ওঠানামা তাঁরও ছিল-ব্যান্ডের সদস্য পরিবর্তন, নতুন অ্যালবাম প্রকাশে দীর্ঘ বিরতি, ডিজিটাল যুগের চ্যালেঞ্জ-তবুও তিনি কখনো নিজের অবস্থান হারাননি। তাঁর প্রতিটি কনসার্ট আজও জনসমুদ্র সৃষ্টি করে এবং তিনি মঞ্চে উঠলেই দর্শকদের মধ্যে অন্যরকম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শুধু গায়ক নয়, তিনি একজন ফটোগ্রাফারও, শিল্পের নানা শাখায় নিজের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি রেখেছেন। জীবনের ব্যক্তিগত অধ্যায়ে বিবাহ, পরিবার ও নীরবতা থাকলেও শিল্পী হিসেবে তাঁর আলো কখনো ম্লান হয়নি। বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনে জেমস কেবল একজন শিল্পী নন, তিনি এক অনন্য প্রতীক, যিনি রক ও বাউল ধারাকে মিশিয়ে একটি স্বতন্ত্র সঙ্গীতধারা তৈরি করেছেন।
আজ তাঁর জন্মদিনে দেশের কোটি ভক্ত তাঁকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও শুভেচ্ছায় ভাসাচ্ছে। জেমস আমাদের শিখিয়েছেন যে সঙ্গীত কেবল বিনোদন নয়, এটি মানুষের আত্মার সঙ্গে কথা বলার একটি শিল্প, এবং তাই তিনি আমাদের সবার গুরু হয়ে উঠেছেন।