রুপালি পর্দার জনপ্রিয় খলনায়ক থেকে আজ বাস্তব জীবনে মুদি দোকানদার সুরজিৎ সেন!

ফারহান তানভীর :

এক সময় ‘হিরোগিরি’, ‘রংবাজ’, ‘চ্যালেঞ্জ ২’ আর ‘বিন্দাস’-এর মতো জনপ্রিয় ছবিতে খলনায়কের ভূমিকায় দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিলেন টলিউড অভিনেতা সুরজিৎ সেন। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি মানেই ছিল এক তীব্রতা, এক আলাদা আকর্ষণ। শক্তিশালী সংলাপ, চোখের দৃষ্টি আর অভিনয়ের গভীরতায় তিনি তৈরি করেছিলেন নিজস্ব পরিচিতি। কিন্তু আজ সেই আলো নিভে এসেছে-যে মানুষকে একসময় ক্যামেরার ফ্ল্যাশে দেখা যেত, এখন তাঁকে দেখা যায় ব্যারাকপুরের এক ছোট্ট মুদির দোকানে।গত পাঁচ বছর ধরে পর্দা থেকে দূরে সুরজিৎ। নেই কোনো সিনেমা, নেই কোনো সিরিয়াল,আলো-ঝলমলে দুনিয়া ছেড়ে তিনি এখন সংসার চালাচ্ছেন দোকানে দাঁড়িয়ে। তাঁর দোকানে বিক্রি হয় চাল, ডাল, বিস্কুট, কোমল পানীয় আর আইসক্রিম। তাতেই চলছে সংসার, চলছে দিনযাপন।

অভিনেতা সুরজিৎ সেন – ফেসবুক থেকে

জীবনের চেনা মঞ্চটা যেন একদম বদলে গেছে-ক্যামেরার সামনে থেকে এখন দোকানের কাউন্টারে।ভারতীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সুরজিৎ বলেছেন, “১৯৯৮ থেকে ২০২০ পর্যন্ত অভিনয় করে আমি মাত্র পাঁচ লাখ টাকা রোজগার করতে পেরেছি। ভাবুন, কতটা কঠিন সময় গেছে!”এই এক বাক্যেই ফুটে ওঠে এক শিল্পীর না বলা কষ্ট, অবহেলায় ঢাকা এক জীবনের বাস্তবতা। সিনেমা জগতে মানুষ যতটা দেখে সাফল্যের ঝলক, পর্দার পেছনে ততটাই লুকিয়ে থাকে অনিশ্চয়তা। একবার কাজ থেমে গেলে যেন সবাই ভুলে যায়, কেউ খোঁজও নেয় না।সুরজিৎ বলেন, এখন আর অভিনয়ে ফেরার ইচ্ছে নেই তাঁর।“অভিনয়ে ফেরার ইচ্ছে নেই আর। এখন নিজের ব্যবসা নিয়েই বাঁচতে চাই।”এই কথায় যেমন আছে হতাশা, তেমনি আছে জীবনের সঙ্গে এক বাস্তব আপোস।

অভিনেতা সুরজিৎ সেন – ফেসবুক থেকে

যিনি একসময় দর্শকদের করতালিতে ভেসেছেন, সেই তিনিই আজ নীরবে বাঁচছেন নিজের মতো করে। দোকানের আলোয় বসে মাঝেমধ্যে হয়তো মনে পড়ে যায় কোনো সংলাপ, কোনো দৃশ্য, কোনো পুরনো সহকর্মীর কথা। কিন্তু তিনি ফিরে তাকান না-কারণ জীবন তাকে শিখিয়েছে, আলো ছেড়ে অন্ধকারেও বাঁচা যায়, যদি ভেতরের আলো নিভে না যায়।সুরজিতের গল্পটা আসলে এক বড় প্রতীক-এটা শুধু একজন অভিনেতার গল্প নয় বরং সেই সব শিল্পীদের গল্প, যাদের প্রতিভা একসময় দর্শকদের মুগ্ধ করেছে কিন্তু এখন হারিয়ে গেছে বিস্মৃতির কোণে। সিনেমার মতো জগতে যেখানে তারকা ওঠে আর নামে প্রতি মুহূর্তে, সেখানে টিকে থাকা মানেই যুদ্ধ।

অভিনেতা সুরজিৎ সেন – ফেসবুক থেকে

আজ সুরজিৎ সেনের জীবন যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়-খ্যাতি ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সম্মান চিরস্থায়ী। আমরা যদি চাই, শিল্পীদের সম্মান দিতে পারি তাদের প্রয়োজনে পাশে থেকে, শুধু তালি নয়, একটু স্বীকৃতি দিয়েও।এক সময় পর্দার উজ্জ্বল মুখ, আজ দোকানের আলোয় ঝাপসা। তবুও তাঁর শান্ত গলায় ভেসে আসে স্থিতধী কণ্ঠ, “আমি এখন নিজের ব্যবসা নিয়েই বাঁচতে চাই।”এই কণ্ঠেই লুকিয়ে আছে এক মানুষের সংগ্রামের গল্প, এক শিল্পীর অমর মর্যাদা-যে কখনও নিভে যায় না, শুধু রূপ বদলায়।