কিভাবে এতো এগিয়ে যাচ্ছে মালায়ালাম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি?-জানালেন দুলকার সালমান

ফারহান তানভীর :

মালায়ালাম ইন্ডাস্ট্রির অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হলেই একটা প্রশ্ন ঘুরে-ওরা কীভাবে এত দ্রুত, এত ধারাবাহিকভাবে, এত মানসম্মত সিনেমা বানাচ্ছে? বাকি অনেক ইন্ডাস্ট্রি যেখানে বাজেট, স্টারডম, বা অতিরিক্ত গ্ল্যামারের ওপর ভর করে টিকে থাকতে চায়, সেখানে কেরালার এই ইন্ডাস্ট্রি ঠিক উল্টো পথে হাঁটে। আর ঠিক এই জায়গাটাই তুলে ধরেছেন দুলকার সালমান-এমনভাবে, যা পুরো শিল্পের শক্তি ও দর্শনের সারমর্ম বুঝিয়ে দেয়।

মলিউড অভিনেতা দুলকার সালমান – ফেসবুক থেকে

দুলকারের মতে, মালায়ালাম ইন্ডাস্ট্রির সাফল্যের কেন্দ্রে রয়েছে তাদের সংস্কৃতি, বিশেষ করে টিমওয়ার্কের সংস্কৃতি। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন-সেখানে কেউ নিজের কাজটা শেষ করলেই থেমে যায় না। যে কাজ তার দায়িত্ব নয়, সেটাও হাতে নেয় শুধু প্রডাকশনের অতিরিক্ত খরচ বাঁচাতে নয়, পুরো ইউনিটের সময় বাঁচাতে, গতি ধরে রাখতে, এবং একটা পারফেক্ট প্রোডাক্ট দিতে। এটা শুধু প্রফেশনালিজম নয়-এটা একটা মানসিকতা, যেটা বছরের পর বছর ধরে সমগ্র ইন্ডাস্ট্রিতে ছড়িয়ে আছে।বাকি জায়গায় যেমন স্টার বা টেকনিশিয়ানরা কাজের মাঝে ঘন ঘন ব্রেক নিয়ে নেয়, মালায়ালামে সেটা প্রায় দেখা যায় না। কারণ, তারা জানে- প্রতিটা মিনিটের দাম আছে। দেরি মানে শুধু খরচ বাড়া নয়; দেরি মানে গল্পের ফোকাস হারানো, ক্রুদের অস্বস্তি, এবং কাজের প্রতি নিষ্ঠায় চিড় ধরা। তাই সবাই বাড়তি একটুখানি দায়িত্ব নেয়। এই “একটুখানি অতিরিক্ত” জিনিসটাই আসলে মালায়ালাম ইন্ডাস্ট্রিকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

মলিউড অভিনেতা দুলকার সালমান – ফেসবুক থেকে

কিন্তু এখানে একটা সমস্যার দিকও আছে, যেটা বলা দরকার। এই টিমওয়ার্ক সংস্কৃতি যতটা শক্তি দেয়, ততটাই একটা চাপও তৈরি করতে পারে। কারণ, যে ইন্ডাস্ট্রি এতটা দক্ষ, এতটা স্কিলড, এবং এত কম সময়–কম বাজেটে এত ভালো কাজ করে, সেখানে স্ট্যান্ডার্ড প্রতিদিনই বাড়ছে। অন্য ইন্ডাস্ট্রিগুলোর কাছে এই স্ট্যান্ডার্ড এখন চাপ হিসেবে দাঁড়িয়েছে-“মালায়ালামের মতো করা” এখন একটা বেঞ্চমার্ক হয়ে গেছে। প্রশ্ন হলো, সবাই কি সেই মানসিকতা নিয়ে কাজ করতে পারবে? নাকি এই তাড়াহুড়োতে অন্যরা গুণগত মান হারাবে?

মালায়ালামের অগ্রগতির আরেকটা আসল কারণ হলো-ওরা সবসময় কনটেন্টকেই হিরো বানায়। যত বড় অভিনেতাই হোক, স্ক্রিপ্ট দুর্বল হলে কাজ শুরু হয় না। যে কারণে ছোট বাজেটের সিনেমাও ভাষা, আবেগ, বাস্তবতা এবং ডিটেইলের দিক থেকে টপ-নচ হয়ে ওঠে। অন্যদিকে অনেক ইন্ডাস্ট্রি এখনো স্টারডমের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, যেখানে গল্পের তাগিদ অনেক সময় কমে যায়।এখানে আরেকটা জিনিস দেখা যায়-তারা লোকেশন, টেকনিক, বাস্তব অভিজ্ঞতা, এবং মানবিক গল্পগুলোর সঙ্গে অদ্ভুত এক সত্যতা ধরে রাখতে পারে। পরিবেশ, সংলাপ, চরিত্র-সবকিছুই দারুণভাবে গ্রাউন্ডেড। দর্শক কোনোদিন মনে করে না যে সে একটা সাজানো সেটে রয়েছে; বরং মনে হয় সে চরিত্রের ভেতরে ঢুকে পড়েছে।

মলিউড অভিনেতা দুলকার সালমান – ফেসবুক থেকে

দুলকার সালমানের মন্তব্য তাই কেবল প্রশংসা নয়- এটা পুরো ইন্ডাস্ট্রির ওয়ার্ক এথিকের একটা রোডম্যাপ। তিনি জানিয়ে দিলেন, মালায়ালাম ইন্ডাস্ট্রি এগোচ্ছে কারণ তারা নিজেদের কাজকে শুধু কাজ হিসেবে দেখে না, একটা দায় হিসেবে দেখে-দর্শকের প্রতি দায়, গল্পের প্রতি দায়, আর নিজেদের সহকর্মীদের প্রতি দায়।

অন্য ইন্ডাস্ট্রিগুলো যদি সত্যিই এগোতে চায়, তাহলে মালায়ালাম ইন্ডাস্ট্রিকে কপি করা নয়-তাদের এই মনোভাবটাকে শেখা দরকার। ফিল্মমেকিং কখনো একার খেলা ছিল না; এটা সবসময়ই ছিল টিমের জয়ের গল্প। মালায়ালাম শুধু সেই সত্যিটা আগে বুঝেছে, আর সেজন্যই তারা এখন দেশের সবচেয়ে ধারাবাহিকভাবে মানসম্মত সিনেমা তৈরি করা ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে উঠে এসেছে।