ফারহান তানভীর :
বাংলাদেশের প্রখ্যাত চিত্রনায়ক ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের প্রবক্তা ইলিয়াস কাঞ্চন এখন জীবনের এক কঠিন অধ্যায়ে রয়েছেন। জনপ্রিয় এই অভিনেতা বর্তমানে লন্ডনে ব্রেন টিউমারের চিকিৎসা নিচ্ছেন। প্রায় সাত মাস ধরে তিনি অসুস্থ, আর ছয় মাস ধরে চলছে তাঁর চিকিৎসা। নিজের জীবনজুড়ে অসংখ্য চরিত্রে প্রাণ দিয়েছেন, অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন তিনি, কিন্তু এখন তাঁর সবচেয়ে বড় লড়াই নিজের জীবনকে নিয়ে। সম্প্রতি নিসচা (নিরাপদ সড়ক চাই)-এর এক সংবাদ সম্মেলনে কানাডা থেকে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে ইলিয়াস কাঞ্চনের ছেলে মিরাজুল মইন এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, তাঁর বাবা বর্তমানে লন্ডনে চিকিৎসাধীন এবং অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। সেখানে একমাত্র মেয়ে ইসরাত জাহানের বাসায় থেকে তিনি চিকিৎসা নিচ্ছেন।

গত ২৬ এপ্রিল থেকে ইলিয়াস কাঞ্চন লন্ডনে অবস্থান করছেন। তাঁর চিকিৎসা চলছে হার্লি স্ট্রিট ক্লিনিকের অনকোলজিস্ট ভিনায়ার তত্ত্বাবধানে। চিকিৎসকদের পরামর্শেই তাঁকে পরবর্তীতে লন্ডনের উইলিংটন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত ৫ আগস্ট অধ্যাপক ডিমিট্রিয়াসের নেতৃত্বে তাঁর মাথায় অস্ত্রোপচার করা হয়। ডাক্তারদের মতে, টিউমারটি এমন একটি স্থানে ছিল যেখানে সম্পূর্ণ অপসারণ করলে তাঁর জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারত, এমনকি প্যারালাইজড হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও ছিল প্রবল। তাই ডাক্তাররা সতর্কতার সঙ্গে টিউমারের কেবল কিছু অংশ অপসারণ করেন। বাকি অংশটিকে রেডিয়েশন ও কেমোথেরাপির মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা চলছে। এই চিকিৎসা পদ্ধতিকে ডাক্তাররা ‘টার্গেট থেরাপি’ বলেছেন। সপ্তাহে পাঁচ দিন করে ছয় সপ্তাহ এই থেরাপি চলবে। থেরাপি শেষে চার সপ্তাহ পর্যবেক্ষণে রাখা হবে তাঁকে।

এই দীর্ঘ চিকিৎসা প্রক্রিয়া এবং বিদেশে একাকিত্ব ইলিয়াস কাঞ্চনের মানসিক অবস্থাকেও প্রভাবিত করেছে। জীবনের বেশির ভাগ সময় কর্মব্যস্ততায় কাটানো মানুষটি এখন লন্ডনের এক বাসায় নিঃসঙ্গ। শরীরের দুর্বলতা, থেরাপির ক্লান্তি আর ফোনে কথা বলার নিষেধাজ্ঞা তাঁকে আরও একা করে তুলেছে। তাঁর জামাতা আরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, ইলিয়াস কাঞ্চন সবকিছু বুঝতে পারেন, কিন্তু কথা বলতে কষ্ট হয়। তবুও তিনি নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কার্যক্রমের খবর রাখেন এবং সংগঠনের সঙ্গে ভার্চ্যুয়ালি যোগাযোগের চেষ্টা করেন।

চলচ্চিত্র অঙ্গনে ইলিয়াস কাঞ্চন একজন কিংবদন্তি। সত্তর দশকের শেষ থেকে নব্বই দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত তিনি ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়কদের একজন। তাঁর অভিনীত “বেদের মেয়ে জোছনা”, “পরিনিতা”, “অন্তরঙ্গ”, “চোরাবালি”, “গোলাপী এখন ঢাকায়”সহ অসংখ্য চলচ্চিত্র আজও দর্শকের হৃদয়ে অমলিন। শুধু পর্দার তারকাই নন, তিনি বাস্তব জীবনে একজন সচেতন নাগরিক ও মানবতার কণ্ঠস্বর। ১৯৯৩ সালে তাঁর স্ত্রীকে এক সড়ক দুর্ঘটনায় হারানোর পর তিনি নিজেকে নিবেদন করেন নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে। সেই থেকে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন “নিরাপদ সড়ক চাই” আন্দোলন, যা আজ দেশের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সবচেয়ে প্রভাবশালী সংগঠনগুলোর একটি।

বছরের পর বছর ধরে তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় সরকার “জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস” ঘোষণা করেছে। সিনেমার নায়ক থেকে বাস্তব জীবনের নায়ক-এই রূপান্তরই ইলিয়াস কাঞ্চনকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা করেছে। তাঁর কর্ম, তাঁর সাহস, তাঁর মানবিক অবস্থান তাঁকে সাধারণ মানুষের প্রিয় মুখে পরিণত করেছে। আজ তিনি অসুস্থ, কিন্তু মানুষ তাঁকে ভুলে যায়নি। দেশে-বিদেশে অসংখ্য ভক্ত, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষী প্রতিদিন তাঁর জন্য দোয়া করছেন।চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, যদি থেরাপি সফলভাবে কাজ করে, তাহলে টিউমারের অবশিষ্ট অংশ নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হবে। চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর তাঁর সুস্থতার সম্ভাবনা নিয়ে তাঁরা আশাবাদী। দেশ থেকে তাঁর ছেলে মিরাজুল মইন, জামাতা আরিফুল ইসলাম ও মেয়ে ইসরাত জাহান নিয়মিত তাঁর পাশে রয়েছেন।

সিনেমার মানুষদের মধ্যেও কেউ কেউ নিয়মিত খোঁজ নিচ্ছেন; চিত্রনায়িকা রোজিনা ও সোনিয়া তাঁর বাসায় গিয়েছেন, দোয়া করেছেন।ইলিয়াস কাঞ্চনের ফোন এখন বন্ধ থাকে, চিকিৎসকদের পরামর্শেই তিনি বিশ্রামে আছেন। তবুও তাঁকে ঘিরে সবার প্রত্যাশা একটাই-তিনি যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে আবার নিজের প্রিয় দেশ, প্রিয় মঞ্চে ফিরে আসেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র যেমন তাঁকে ভালোবেসেছে, তেমনি তিনি নিজের জীবন দিয়ে ভালোবেসেছেন এই দেশকে। তাঁর অসুস্থতার খবর পুরো জাতিকে ব্যথিত করেছে, কিন্তু সেই ভালোবাসাই হয়তো হয়ে উঠবে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। এখন শুধু প্রার্থনা-ইলিয়াস কাঞ্চন সুস্থ হয়ে আবার ফিরুন, যেমন একসময় তিনি রূপালি পর্দায় আলো ছড়িয়েছিলেন, তেমনি আবার মানুষের মাঝে আলোকিত হয়ে উঠুন বাস্তব জীবনের অনুপ্রেরণা হয়ে।