মান্নার উপর নির্ভরশীলতা কমাতে নিজের ছেলে মারুফকে সিনেমায় এনেছিলেন কাজী হায়াৎ…

ফারহান তানভীর :

বাংলাদেশি বাণিজ্যিক সিনেমার ইতিহাসে কাজী হায়াৎ-মান্না জুটি একসময় ছিল এক ধরনের নিশ্চিত সাফল্যের সমার্থক। একের পর এক হিট ছবি, দর্শকের উন্মাদনা, প্রেক্ষাগৃহে হাউসফুল বোর্ড-সব মিলিয়ে এই জুটি ইন্ডাস্ট্রির একটি স্বর্ণালী অধ্যায়ের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। আম্মাজান, ধর, লুটতারাজ, সিপাহীসহ অসংখ্য ছবিতে মান্নার উপস্থিতি আর কাজী হায়াতের নির্মাণশৈলী একত্র হয়ে তৈরি করেছিল আলাদা এক ব্র্যান্ড ভ্যালু। কিন্তু সাফল্যের সেই ঝলমলে আবরণের আড়ালে, কাজী হায়াতের মনে এক ধরনের প্রশ্ন ধীরে ধীরে জন্ম নিতে শুরু করে-আমি কি শুধুই মান্না নির্ভর হয়ে পড়ছি? আমার নিজের সাফল্য কি কেবল একজন তারকাকে ঘিরেই দাঁড়িয়ে আছে?

ছবি : তথ্যচিত্র

এই আত্মজিজ্ঞাসা একজন পরিচালকের জন্য খুব সাধারণ বিষয় নয়। কারণ সফল ফর্মুলা ভেঙে নতুন পথে হাঁটা মানে ঝুঁকি নেওয়া, বিশেষ করে যখন সেই ফর্মুলা অর্থ, খ্যাতি এবং দর্শকপ্রিয়তার নিশ্চয়তা দেয়। কিন্তু কাজী হায়াৎ নিজের ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করেছিলেন-যদি সবকিছু একটি মুখের ওপর নির্ভর করে, তাহলে তার নিজস্ব নির্মাতা সত্তা ধীরে ধীরে ছায়ার নিচে চলে যাবে। সেই উপলব্ধি থেকেই জন্ম নেয় একটি সাহসী সিদ্ধান্ত-নিজের ছেলে কাজী মারুফকে সিনেমায় নিয়ে আসা।

কাজী হায়াতের ভাষ্যমতে, এক রাতেই তিনি ইতিহাস সিনেমার স্ক্রিপ্ট লেখেন। চরিত্রায়ন তৈরি করে মারুফকে জানান তার পরিকল্পনার কথা। মারুফ প্রথমে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে নেয়নি। তার মনে হয়েছিল, বাবা হয়তো মজা করছে বা আবেগী হয়ে কিছু বলছে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই বিষয়টি বাস্তবে রূপ নেয় এবং মারুফের জন্য সেই মুহূর্তটি হয়ে ওঠে এক নতুন যাত্রার সূচনা। ইতিহাস মুক্তির পর দর্শকপ্রতিক্রিয়া ছিল ব্যাপক এবং মারুফ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পথে এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এগিয়ে যায়।

ছবি : বাংলা ভিশন

এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল শুধু পিতৃত্বের আবেগ নয় বরং একটি কৌশলগত চিন্তাও। কাজী হায়াৎ চেয়েছিলেন নিজের ব্র্যান্ডকে একজন তারকার সীমা ছাড়িয়ে নির্মাতার শক্তিতে প্রতিষ্ঠিত করতে। মান্নার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন-তার সিনেমা শুধু একটি মুখের কারণে নয় বরং গল্প, নির্মাণশৈলী ও দর্শকপালস বোঝার দক্ষতার কারণেই কাজ করে।

তবে এই পরিবর্তনের সময় মান্নার মনোভাবও ছিল জটিল। কাজী হায়াতের মতে-মান্না হয়তো মনে করেছিলেন, নতুন নায়ককে সামনে আনলে তার স্টারডমে প্রভাব পড়তে পারে। একদিন হঠাৎ করে মান্না এক লাখ টাকা নিয়ে কাজী হায়াতের কাছে হাজির হন এবং সরাসরি বলেন, “কবে ডেট দিবেন বলেন। আপনার সাথে আবার সিনেমা করবো।” এই দৃশ্য শুধু একটি আর্থিক লেনদেনের গল্প নয়-এটি ছিল একজন সুপারস্টারের আত্মবিশ্বাস, আবার একই সঙ্গে তার অনিশ্চয়তারও প্রতিফলন। তিনি বুঝেছিলেন, ইন্ডাস্ট্রিতে সম্পর্ক, উপস্থিতি এবং ধারাবাহিকতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

ছবি : কালের কন্ঠ

কাজী হায়াৎ রাজি হন, কিন্তু মনে মনে তিনি একটি বিষয় গভীরভাবে উপলব্ধি করেন-মান্নার জায়গা কেউ নিতে পারবে না। সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “মান্না তো মান্নাই।” এই বক্তব্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে একটি নির্মাতার পরিপক্বতা। তিনি বুঝেছিলেন, নতুন মুখ তৈরি করা যায়, নতুন তারকা গড়ে তোলা যায়, কিন্তু কিছু ব্যক্তিত্ব সময়ের সীমা ছাড়িয়ে আইকনে পরিণত হয়। মান্না ছিলেন সেই ধরনের একজন অভিনেতা, যিনি শুধু অভিনয় দিয়ে নয়, ব্যক্তিত্ব, উপস্থিতি এবং দর্শকের আবেগ দিয়ে নিজের জন্য আলাদা একটি জায়গা তৈরি করেছিলেন।

ছবি : মিডিয়া টুডে

এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি দেখায়, কিভাবে একজন পরিচালক নিজের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে, নতুন ঝুঁকি নেয়, আবার একই সঙ্গে নিজের দীর্ঘদিনের সহযোগীর প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখে। কাজী হায়াতের এই আত্মসংঘাত, মান্নার প্রতিক্রিয়া, আর মারুফের উত্থান-সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি ইন্ডাস্ট্রি গল্প নয়, বরং মানুষের অহং, ভয়ের, আত্মবিশ্বাস এবং উত্তরাধিকারের গল্প।

শেষ পর্যন্ত, কাজী হায়াত বুঝেছিলেন, স্টারডম ভাগ করা যায় না, কিন্তু ইতিহাস তৈরি করা যায়। আর মান্নার ক্ষেত্রে ইতিহাস আগেই লেখা হয়ে গিয়েছিল। তাই তিনি নিঃসংকোচে বলতে পেরেছিলেন-মান্না তো মান্নাই।