ফারহান তানভীর:
বাংলাদেশি সিনেমায় দিন দিন একটি নতুন প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে-একক সিনেমা নয় বরং একটি বিস্তৃত গল্পজগত বা “ইউনিভার্স” তৈরি করা। এই ধারায় সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত নাম পরিচালক মেহেদী হাসান হৃদয়। তিনি নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তার পরিকল্পিত “ভায়োলেন্স ইউনিভার্স”-এর ঘোষণা দিয়েছেন।সেই ইউনিভার্সের প্রথম কিস্তি ছিল বরবাদ এবং দ্বিতীয় কিস্তি হিসেবে এই ইদে আসছে রাক্ষস। বাংলাদেশের মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমায় এই ধরনের পরিকল্পিত ইউনিভার্স এখনও নতুন ধারণা, তাই বিষয়টি চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্যে কৌতূহলও তৈরি করেছে।

২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরে মুক্তি পাওয়া ‘বরবাদ’ ছিল হৃদয়ের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। এতে অভিনয় করেছেন শাকিব খান, ইধিকা পাল এবং জিশু সেনগুপ্তসহ আরও অনেক পরিচিত মুখ। প্রায় ১৫–১৮ কোটি টাকার বাজেটে নির্মিত এই অ্যাকশন থ্রিলার মুক্তির পর ব্যাপক ব্যবসা করে এবং বিশ্বব্যাপী প্রায় ৭৫ কোটির বেশি আয় করে বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত বাণিজ্যিক সাফল্যে পরিণত হয়। সিনেমাটির সহিংসতা, স্টাইলাইজড অ্যাকশন এবং অন্ধকার টোন থেকেই বোঝা যায় যে পরিচালক গল্পটিকে একটি বৃহৎ ধারাবাহিক জগতের অংশ হিসেবে ভাবছেন। সেই ধারাবাহিকতার দ্বিতীয় ধাপ হিসেবে তৈরি হচ্ছে ‘রাক্ষস’, যেখানে প্রধান চরিত্রে দেখা যাবে সিয়াম আহমেদকে।

এই দুই সিনেমার মধ্যকার সংযোগের একটি মজার দিকও ইতিমধ্যে দর্শকদের নজরে এসেছে। ‘বরবাদ’ সিনেমায় শাকিব খান তথা আরিয়ান মির্জা চরিত্রের পিএ ছিল ভারতীয় অভিনেতা শ্যাম ভট্টাচার্য তথা জিল্লু। ছোট চরিত্র হলেও দর্শকদের কাছে বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছিল সেই চরিত্রটি। ট্রেলার প্রকাশের পর দেখা যায়, ‘রাক্ষস’ সিনেমাতেও এই চরিত্রটিকে রাখা হয়েছে এবং খুব সম্ভবত সেখানে তাকে সিয়াম আহমেদের চরিত্রের পিএ হিসেবেই দেখা যাবে। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এখানেও তার নাম রাখা হয়েছে ‘জিল্লু’। এই পুনরাবৃত্ত চরিত্রই মূলত ইউনিভার্সের ধারাবাহিকতার একটি ইঙ্গিত দেয়।ডায়লগের ক্ষেত্রেও এই সংযোগটি দর্শকদের মধ্যে বেশ আলোচনা তৈরি করেছে। ‘বরবাদ’-এর টিজার প্রকাশের পর শাকিব খানের একটি সংলাপ-“এই জিল্লু, মাল দে”-সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ ভাইরাল হয়ে যায়। ঠিক একইভাবে ‘রাক্ষস’-এর ট্রেলার প্রকাশের পর সিয়াম আহমেদের মুখে শোনা যায় আরেকটি সংলাপ-“এই জিল্লু, খাইয়া দে।” দুই সিনেমার এই সংলাপগত মিল অনেক দর্শকের কাছেই মজার একটি ইঙ্গিত হিসেবে ধরা দিয়েছে, যা ভায়োলেন্স ইউনিভার্সের ধারণাটিকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।

এই ধরনের “ইউনিভার্স” ধারণা অবশ্য বাংলাদেশের সিনেমায় একেবারে মৌলিকভাবে জন্ম নেয়নি; বরং এর অনুপ্রেরণা এসেছে মূলত ভারতীয় সিনেমা শিল্প থেকে। গত এক দশকে ভারতীয় চলচ্চিত্রে ইউনিভার্স নির্মাণ একটি বড় ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি হলো YRF Spy Universe, যেখানে একাধিক সুপারস্পাই চরিত্র একই জগতের অংশ হয়ে উঠেছে। এই ইউনিভার্সের প্রথম বড় সাফল্য আসে Ek Tha Tiger দিয়ে, এরপর War, Pathaan এবং Tiger 3-এর মতো সিনেমা একই গল্পের ভেতর সংযুক্ত হয়ে একটি বিশাল দর্শকভিত্তি তৈরি করে।একইভাবে বলিউডে আরেকটি জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি হলো Maddock Horror Comedy Universe। এখানে Stree, Bhediya এবং Roohi–এর মতো সিনেমাগুলো ভৌতিক উপাদানকে কমেডির সঙ্গে মিলিয়ে একই জগতের অংশ হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। দর্শকরা এক সিনেমার চরিত্রকে অন্য সিনেমায় দেখতে পাচ্ছেন, ফলে গল্পের পরিধি বড় হচ্ছে এবং প্রতিটি নতুন সিনেমা আগেরটির জনপ্রিয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। মূলত এই কৌশলই প্রমাণ করেছে যে ইউনিভার্স কনসেপ্ট শুধু গল্প বলার পদ্ধতি নয়, এটি একটি শক্তিশালী ব্যবসায়িক মডেলও।

বাংলাদেশেও এই ইউনিভার্সের ধারণা ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে পরিচালক রায়হান রাফি তার সিনেমাগুলোর মধ্যেও একটি ঢিলেঢালা ইউনিভার্স তৈরির ইঙ্গিত দিয়েছেন। তার নির্মিত ‘সুড়ঙ্গ’ এবং ‘তুফান’-এর গল্পের ভেতর অপরাধজগত, ক্ষমতার রাজনীতি এবং অন্ধকার বাস্তবতার যে মিল পাওয়া যায়, তা অনেকেই একটি সম্ভাব্য “রাফি ইউনিভার্স”-এর শুরু হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে ‘তুফান’-এ আন্ডারওয়ার্ল্ডের যে বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা ভবিষ্যতে আরও কিছু সংযুক্ত গল্পের সম্ভাবনা তৈরি করে।
এই প্রেক্ষাপটে মেহেদী হাসান হৃদয়ের “ভায়োলেন্স ইউনিভার্স” পরিকল্পনাকে অনেকেই বাংলাদেশের সিনেমায় একটি নতুন পরীক্ষামূলক ধাপ হিসেবে দেখছেন। কারণ ইউনিভার্স তৈরির জন্য শুধু একটি সফল সিনেমা যথেষ্ট নয়; দরকার সুসংগঠিত গল্প, ধারাবাহিক চরিত্র এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। যদি ‘বরবাদ’ ও ‘রাক্ষস’-এর পর আরও কয়েকটি চলচ্চিত্র একই জগতের অংশ হিসেবে তৈরি হয়, তাহলে সেটি বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সিনেমার জন্য একটি নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।