ফারহান তানভীর :
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ঘিরে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরেই শিল্পী, নির্মাতা ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে-বিচারপ্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, কতটা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আর কতটা প্রকৃত মেধাকে সম্মান জানায়। এ ধরনের আলোচনা কেবল সমালোচনার জন্য নয় বরং দেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে একটি সুস্থ, পেশাদার ও বিশ্বাসযোগ্য কাঠামোর মধ্যে দাঁড় করানোর প্রয়োজনীয়তার কথাই সামনে আনে।নবগঠিত সরকারের কাছে এমনই কিছু চাওয়ার কথা বলেছেন সুপারস্টার শাকিব খান।

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের মতো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য মূল্যায়ন মানদণ্ড থাকা জরুরি। একই সঙ্গে বিচারক প্যানেল, স্কোরিং পদ্ধতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া যেন জনসম্মুখে জবাবদিহির আওতায় থাকে-সে দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। বাইরের কোনো ধরনের প্রভাব, রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত, কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা না গেলে এই পুরস্কারের মর্যাদা বারবার প্রশ্নের মুখে পড়বে।একইভাবে সরকারি অনুদানের চলচ্চিত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রায়ই অভিযোগ ওঠে, প্রকৃত প্রতিভা নয়, বরং সম্পর্ক, পরিচয় বা পক্ষপাতের ভিত্তিতে প্রকল্প নির্বাচিত হয়। এ ধরনের ধারণা শিল্পের জন্য ক্ষতিকর, কারণ এতে নতুন নির্মাতা ও সৃজনশীল প্রতিভারা নিরুৎসাহিত হন। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনলাইন স্কোরিং, স্বচ্ছ কমিটি গঠন এবং নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ্য রিপোর্ট আকারে প্রকাশ করা হলে আস্থার সংকট অনেকাংশে কমবে। এতে বোঝা যাবে কোন প্রকল্প কেন নির্বাচিত হলো, কী মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা হয়েছে, এবং ভবিষ্যতে নির্মাতারা কীভাবে নিজেদের প্রকল্প উন্নত করতে পারেন।

বাংলাদেশে প্রেক্ষাগৃহ সংকট আরেকটি বড় বাস্তবতা। এক সময় যেখানে প্রতিটি জেলায় একাধিক হল ছিল, সেখানে এখন বহু হল বন্ধ বা জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। মাঝে মাঝে হল বাড়ানোর উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও বাস্তবে দৃশ্যমান অগ্রগতি সীমিত। অথচ দর্শক যে সিনেমা দেখতে আগ্রহী নয়-এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। পরিবার নিয়ে হলে গিয়ে ছবি দেখার প্রবণতা আবার বাড়ছে-প্রয়োজন শুধু নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক পরিবেশ। সারা দেশে নতুন প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণের পাশাপাশি পুরোনো হল সংস্কারের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ, করছাড় এবং পুনর্গঠন তহবিল গঠন করা যেতে পারে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে আধুনিক মাল্টিপ্লেক্স স্থাপনে উৎসাহ দিলে বিনিয়োগ বাড়বে এবং শহর ও মফস্বলের দর্শকের অভিজ্ঞতা উন্নত হবে।যেসব জেলায় বড় প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ সম্ভব নয়, সেখানে কম আসনসংখ্যার ডিজিটাল মিনি প্রেক্ষাগৃহ একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। এতে নির্মাণ ব্যয় কমবে এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে। নতুন হল নির্মাণে ভ্যাট ও ট্যাক্সছাড়, জমি লিজে বিশেষ সুবিধা এবং আমদানি করা প্রজেকশন ও সাউন্ড সিস্টেমে শুল্ক কমানোর মতো প্রণোদনা দিলে বেসরকারি খাত বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল প্রজেকশন, উন্নত সাউন্ড সিস্টেম এবং অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করলে দর্শকের অভিজ্ঞতা আরও উন্নত হবে এবং হলমুখী দর্শক বাড়বে।

দেশীয় চলচ্চিত্রের জন্য নির্দিষ্ট প্রদর্শন কোটা, উৎসবভিত্তিক বিশেষ প্রদর্শনী এবং পরিবারবান্ধব কনটেন্টে সহায়তা দিলে স্থানীয় সিনেমার বাজার আরও শক্তিশালী হতে পারে।প্রেক্ষাগৃহকে শুধু সিনেমা প্রদর্শনের স্থান হিসেবে না দেখে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ধারণাটিও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে চলচ্চিত্র উৎসব, আলোচনা সভা, কর্মশালা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন করা গেলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে চলচ্চিত্র সংস্কৃতি আরও গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়বে। এতে সিনেমা শুধু বিনোদন নয় বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংলাপের মাধ্যম হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারবে।

সবশেষে, শিল্পীদের জন্য একটি ঝামেলামুক্ত, পেশাদার ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, সংগীত ও নাট্যাঙ্গনের মানুষরা চান যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন, স্বাধীন সৃজনশীলতা এবং নিরাপদ কর্মক্ষেত্র। স্বচ্ছ নীতি ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছাড়া এই প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব নয়। সংস্কৃতি খাতের উন্নয়ন মানে শুধু বিনোদন শিল্পের উন্নয়ন নয়, এটি জাতীয় পরিচয়, সফট পাওয়ার এবং অর্থনীতির সাথেও গভীরভাবে যুক্ত। তাই নীতিনির্ধারকদের উচিত দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিয়ে এই খাতকে নতুন করে সাজানো-যাতে শিল্পীরা সম্মান পান, দর্শক মানসম্মত কনটেন্ট পান, আর বাংলাদেশি চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক পরিসরেও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।
সোর্স: প্রথম আলো