কোথায় হারিয়ে গেলেন আরেফিন রুমি?

ফারহান তানভীর :

একটা সময় ছিল, যখন মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়াত এক জীবন, এক জীবন দুই, তোমারই পরশে-রোমান্টিকতার প্রতিটি মুহূর্তে যেন আরেফিন রুমির কণ্ঠই হয়ে উঠেছিল অনুভূতির ভাষা। প্রেম, বিচ্ছেদ, স্মৃতি-সব আবেগে তার গান ছিল অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। নাটক, সিনেমা, অ্যালবাম-সবখানেই ছিল তার দাপট। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিচিত কণ্ঠ যেন একটু একটু করে আড়ালে চলে যেতে থাকে। তখনই প্রশ্ন উঠে-কোথায় হারিয়ে গেলেন আরেফিন রুমি?

ছবি : ফেসবুক থেকে

এই প্রশ্নটাই এক সাক্ষাৎকারে সরাসরি করা হয়েছিল তাকে। প্রশ্নটি হয়তো অনেকের কাছে কঠিন, কিন্তু রুমি নিজেই বিষয়টি দেখেন ভিন্নভাবে। তিনি বলেন, “এটা আমার কাছে কঠিন প্রশ্ন না। আমার কাছে এর খুব সহজ একটা উত্তর আছে। আমাদের ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে বড় নাম এখন শাকিব খান। তাকে কি আপনি আগের মতো বছরে ১২-১৩টা সিনেমায় দেখছেন? এখন বছরে খুব বেশি হলে একটা সিনেমায় দেখা যায়। স্টারডমটা বজায় রাখতে এভেইলেবল হলেই হয় না। পার্ফেক্ট টাইম, ভালো কনটেন্ট-সব মিলিয়ে ভালো একটা কম্বিনেশন হলে তখনই স্টারদের দেখা পাওয়া যায়। আমার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা এমন। আগে বছরে প্রচুর গান বেরিয়েছে, এখন কমে দিয়েছি। আমি হারিয়ে যাইনি।”রুমির এই বক্তব্য তার ক্যারিয়ারের বর্তমান বাস্তবতাকেই তুলে ধরে। এক সময় যে শিল্পী ছিলেন সর্বত্র উপস্থিত, আজ তিনি বেছে বেছে কাজ করেন-এটাই তার ব্যাখ্যা।

ছবি : ফেসবুক থেকে

আরেফিন রুমি মূলত আধুনিক বাংলা গানের অন্যতম জনপ্রিয় কণ্ঠ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ২০০০-এর দশকের শেষভাগে। রোমান্টিক গান দিয়ে তিনি যে জনপ্রিয়তার ঢেউ তুলেছিলেন, তা খুব কম শিল্পীই পেরেছেন। টেলিভিশন নাটক, সিনেমা, একক অ্যালবাম-সব ক্ষেত্রেই তার গান ব্যাপক সাড়া ফেলে।শুধু প্রেমের গান নয়, জাতীয় আবেগেও তিনি নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন। ২০১১ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের জন্য গাওয়া “জ্বলে ওঠো বাংলাদেশ” গানটি তখন দেশের ক্রীড়াপ্রেমীদের মধ্যে আলাদা উন্মাদনা সৃষ্টি করেছিল। ক্রিকেট ও সংগীত-দুই আবেগের মিলনে এই গান হয়ে উঠেছিল একটি প্রজন্মের স্মৃতি।

তবে তার ক্যারিয়ারে বিতর্কও এসেছে। ২০১৩ সালে প্রথম স্ত্রীর দায়ের করা যৌতুক ও নির্যাতনের মামলায় তার নাম উঠে আসে, যা তখন গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই মনে করেছিলেন, এই ঘটনা হয়তো তার ক্যারিয়ারে বড় ধাক্কা দেবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সেই ঘটনার পরেও তিনি নিয়মিত গান প্রকাশ করেছেন এবং কাজ চালিয়ে গেছেন। অর্থাৎ বিতর্ক তার ক্যারিয়ার থামিয়ে দিতে পারেনি বরং তিনি নিজের মতো করে সংগীতযাত্রা অব্যাহত রেখেছেন।

ছবি : ফেসবুক থেকে

তবে সময়ের সঙ্গে সংগীত ইন্ডাস্ট্রির কাঠামো বদলে গেছে। ইউটিউব, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, নতুন ধারার শিল্পী-সব মিলিয়ে প্রতিযোগিতা বেড়েছে বহুগুণ। যেখানে এক সময় বছরে অসংখ্য নাটক ও সিনেমার গান বের হত, সেখানে এখন শিল্পীরা নিজেরাই কাজ বেছে নিচ্ছেন, ব্র্যান্ডিং ও কনটেন্ট নিয়ে আরও সচেতন হচ্ছেন। রুমিও তার ব্যতিক্রম নন।আজ আরেফিন রুমি আগের মতো সর্বত্র নেই, কিন্তু পুরোপুরি হারিয়েও যাননি। তার গান এখনও বহু মানুষের প্লেলিস্টে বাজে, নস্টালজিয়ার অংশ হয়ে আছে। হয়তো তিনি আগের মতো অতটা দৃশ্যমান নন, কিন্তু নিজের ভাষায়-তিনি হারিয়ে যাননি, বরং নিজেকে নতুনভাবে সংযত করেছেন।

ছবি : ফেসবুক থেকে

তবুও প্রশ্ন থেকেই যায়-যদি সময়ের সাথে নিজেকে আরও শক্তভাবে রিব্র্যান্ডিং করতে পারতেন, যদি নতুন ধারার কনটেন্টে আরও আগ্রাসী উপস্থিতি থাকত, তাহলে কি আজও তিনি বাংলা সংগীতের প্রথম সারির আলোচনায় থাকতেন?আরেফিন রুমির গল্প তাই শুধু একজন শিল্পীর নয়-এটা সময়, ট্রেন্ড, বিতর্ক আর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের মিশেলে এক তারকার ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যাওয়ার গল্প।তবুও তার ভক্তরা অপেক্ষায় থাকেন তার নতুন গানের,নতুন সুরের।