আম্মাজান সিনেমায় মান্নার মায়ের চরিত্রে থাকার কথা ছিল শাবানার!

ফারহান তানভীর :

বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে কিছু চলচ্চিত্র শুধু বিনোদন নয়, সময়ের সাক্ষ্য হয়ে থাকে। ‘আম্মাজান’ ঠিক তেমনই একটি ছবি-যেটা মুক্তির পর শুধু বক্স অফিসে ঝড় তোলেনি, বরং সামাজিক বাস্তবতা, মাতৃত্ব, এবং মানুষের ভেতরের নৈতিক দ্বন্দ্বকে নতুন করে আলোচনায় এনে দিয়েছিল। এই ছবির পেছনের গল্পও ঠিক ততটাই নাটকীয়, যতটা শক্তিশালী ছিল এর পর্দার কাহিনী।

ছবি : ইউটিউব থেকে

এই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে ছিলেন জনপ্রিয় নায়ক মান্না, আর প্রতিপক্ষ চরিত্রে ছিলেন ডিপজল। পরিচালনায় ছিলেন কাজী হায়াৎ, যিনি বরাবরই সামাজিক বাস্তবতাভিত্তিক গল্প বলতে সাহসী ছিলেন। মজার বিষয় হলো, ছবির প্রযোজক ছিলেন ডিপজল নিজেই। কিন্তু এখান থেকেই শুরু হয় প্রথম বড় দ্বন্দ্ব। কাজী হায়াৎ যখন জানান যে মান্নাকে নায়ক হিসেবে নেওয়া হবে, তখন ডিপজল সরাসরি নারাজ হয়ে যান। কারণ তখন মান্না ও ডিপজলের মধ্যে ব্যক্তিগত মনোমালিন্য ছিল। বিষয়টা এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে প্রযোজক হয়েও ডিপজল মান্নাকে গ্রহণ করতে চাইছিলেন না।কিন্তু মান্না ব্যক্তিগতভাবে ডিপজলের সঙ্গে কথা বলেন, ভুল বোঝাবুঝি দূর করেন এবং শেষ পর্যন্ত তাকে ছবির জন্য রাজি করান। এই ঘটনাই দেখায়, ব্যক্তিগত ইগোর ঊর্ধ্বে উঠে শিল্পের জন্য তারা কতটা পেশাদার হতে পেরেছিলেন।

ছবি : ইউটিউব থেকে

এই ছবির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল মায়ের চরিত্র। প্রথমে এই চরিত্রের জন্য ভাবা হয়েছিল কিংবদন্তি অভিনেত্রী শাবানাকে। স্ক্রিপ্ট শুনে শাবানা চরিত্রটি পছন্দও করেন এবং অভিনয়ের জন্য সম্মতি দেন। কিন্তু এখানেও তৈরি হয় বিতর্ক। শাবানার সঙ্গে কাজ করা অন্যান্য নায়করা তাকে পরামর্শ দেন, যদি তিনি মান্নার মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেন, তাহলে ভবিষ্যতে তাদের সঙ্গে কাজ করলে তা নাকি তাদের ইমেজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আরও বলা হয়, শাবানা সবসময় আদর্শবান নারীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন, তাই ধর্ষিতা নারীর চরিত্রে অভিনয় করলে তার ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই সামাজিক ও ইন্ডাস্ট্রির চাপের কারণেই শেষ পর্যন্ত শাবানা চরিত্রটি ফিরিয়ে দেন।পরবর্তীতে কাজী হায়াতের এক সাংবাদিক বন্ধু অভিনেত্রী শবনমের নাম প্রস্তাব করেন। সেখান থেকেই শবনম মায়ের চরিত্রে চূড়ান্ত হন এবং এই চরিত্রের মাধ্যমে তিনি এমন এক অভিনয় উপহার দেন, যা আজও দর্শকের চোখ ভিজিয়ে দেয়।

ছবি : ফেসবুক থেকে

‘আম্মাজান’ সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর গান। বিশেষ করে “আম্মাজান আম্মাজান” গানটি বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম আইকনিক গান হিসেবে বিবেচিত। গানটিতে সুর দিয়েছিলেন প্রয়াত কিংবদন্তি আয়ুব বাচ্চু। তিনি সাধারণত বাংলা সিনেমায় খুব বেশি গান করতেন না। কিন্তু সংগীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের অনুরোধে তিনি এই ছবির জন্য সুর দিতে রাজি হন। ফলাফল-একটি গান, যা শুধু সিনেমার সীমানা ছাড়িয়ে হয়ে ওঠে জাতিগত আবেগের প্রতীক। আজও এই গান বাংলাদেশের অলটাইম হিট গানের তালিকায় শীর্ষস্থানে।

ছবি : ইউটিউব থেকে

আরেকটি মজার ব্যাপার হলো, ছবির মুক্তির আগে ডিপজল নিজেই হতাশ ছিলেন। ছবিতে তেমন কোনো বড় অ্যাকশন দৃশ্য বা রোমান্টিক উপাদান ছিল না। তিনি ভেবেছিলেন, এই ধরনের ছবি দর্শক গ্রহণ করবে না। কিন্তু কাজী হায়াৎ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন গল্পের শক্তিতে। তিনি বলেছিলেন, “সিনেমায় শুধু মারামারিই কি সব? কাহিনীও তো দরকার।”পরবর্তীতে ইতিহাস প্রমাণ করে, কাজী হায়াৎ ঠিকই ছিলেন। ছবিটি বক্স অফিসে ব্যাপক সাফল্য পায়। শুধু গান আর টেবিল মানি থেকেই ছবির বাজেটের চেয়েও দুই লাখ টাকা বেশি আয় হয়েছিল-যা সেই সময়ের জন্য ছিল বিশাল সাফল্য।

‘আম্মাজান’ শুধু একটি সিনেমা নয়, এটি বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা, নারীর সংগ্রাম, মাতৃত্বের গভীরতা এবং মানবিক অনুভূতির এক শক্তিশালী দলিল। এই ছবির পেছনের দ্বন্দ্ব, ইগো, সিদ্ধান্ত এবং ঝুঁকি-সবকিছু মিলিয়ে এটি হয়ে উঠেছে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক কিংবদন্তি অধ্যায়।