মান্নার ”আম্মাজান”-কে টপকে কিভাবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেলেন জাহিদ হাসান?

রবিউল ইসলাম বিদ্যুৎ:

১৯৯৪ সালে সিপাহী’র সিনেমার জন্য ইলিয়াস কাঞ্চনের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার না পfওয়াটা এখনও তার ভক্তদের কষ্ট দিয়ে থাকে। ঠিক একইভাবে মান্নাভক্তদের নিদারুণ কষ্টের বছর ১৯৯৯। এই বছর কাজী হায়াৎ-এর “আম্মাজান” সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছিল। অকাল প্রয়াত কিংবদন্তি নায়ক মান্নার “আম্মাজান” চরিত্রে অভিনয় করেন কিংবদন্তি অভিনেত্রী শবনম। কাজী হায়াৎ এই সিনেমায় সামাজিক এবং আবেগঘন এক চিত্রনাট্য তৈরি করেন। যা এরআগে তাকে কখনোও  করতে দেখা যায়নি। আর মান্না নিজেকে নিংড়ে দিয়ে “আম্মাজান” সিনেমায় অভিনয় করেন। তার অভিনয় এতটা অনবদ্য ছিল যে চলচ্চিত্র বিশ্লেষকরা ধারণা করেছিলেন এই সিনেমার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেতে চলেছেন মান্না; কিন্তু জুরি বোর্ড মান্নাকে নয়, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্য সেরা অভিনেতার ক্যাটাগরিতে বাছাই করেছিল ছোট পর্দার বড় তারকা জাহিদা হাসানকে। তিনি প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক, লেখক ও পরিচালক হুমায়ন আহমেদের “শ্রাবন মেঘের দিন” সিনেমার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। কেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাননি মান্না? তার প্রতি কি জুরি বোর্ড অবিচার করেছে?

আম্মাজান সিনেমায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার না পেয়ে খুবই হতাশ হয়েছিলেন মান্না। মৃত্যুর আগে তিনি সে কথা একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেও গিয়েছেন। মান্না বলেছিলেন,“ আম্মাজান সম্পর্কে অনেক সুখ আছে আমার। আবার অনেক দুঃখও আছে। দুঃখটা হচ্ছে, এই ছবিটা এত জনপ্রিয়তা পেয়েছে, এত নাম ডাক সারাদেশব্যাপী, বিদেশের মাটিতেও আম্মাজানের প্রচুর প্রশংসা শুনেছি। আম্মাজান ছবির বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাল অভিনয় করার জন্য আমেরিকা, লন্ডন, দুবাই, ইতালিতে বিভিন্ন জায়গায় আমি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি। সাংবাদিক ভাইয়েরা এই ছবির জন্য আমাকে আওয়ার্ড দিয়েছেন। প্রযোজক সমিতি আমাকে অ্যাওয়ার্ড দিয়েছে। ছবিটি ছিল সব জায়গায় প্রশংসিত। একজন রিক্সাওয়ালা থেকে শুরু করে একজন উচ্চ শিক্ষিত লোক, একটা শিশু বাচ্চা থেকে শুরু করে বৃদ্ধ মা, বাবা, আপামর জনতা সবাই ছবিটি পছন্দ করেছে। আমার অভিনয়ের প্রশংসা করেছে। এই ছবিতে সবকিছু পেলাম কিন্তু জাতীয় পুরস্কারটা পেলাম না।”

আম্মাজানকে নিয়ে রুপালি পর্দায় মান্না যে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা ঘটিয়েছিলেন তা এককথায় ছিল অনবদ্য। বাংলা চলচ্চিত্রে মা-কে কেন্দ্র করে যত সিনেমা নির্মিত হয়েছে “আম্মাজান” তারমধ্যে অন্যতম সেরা।  অসাধারণ অভিনয়ের পরেও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার না পাওয়ায় মান্নার হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে সেটি তার কথাতেই স্পষ্ট। তিনি বলেন ,“জাতীয় পুরস্কারটা না পাওয়ায় আমার ভেতরে একটা দুঃখবোধ আছে। যে ছবিটার এত প্রশংসা পেয়েছি, আম্মাজান আম্মাজান গানটা দেশের মাটিতে, বিদেশের মাটিতে, সাংবাদিক ভাইয়েরা যেখানে অ্যাওয়ার্ড দিলেন, প্রযোজক সমিতি অ্যাওয়ার্ড দিল, ইতালিতে, দুবাইতে সব জায়গায় অ্যাওয়ার্ড পেলাম কিন্তু আমি জাতীয় পুরস্কারটা পেলাম না।”

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্য ১৯৯৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত আম্মাজানের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল  শ্রাবন মেঘের দিন ছবিটি। মান্না না জাহিদ হাসান-কে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা, জুরিবোর্ডের নির্বাচন করতে ঘাম ঝরাতে হয়েছিল! মান্না-জাহিদ হাসান দুজনেই সমান ভোট পেয়েছিলেন। তারপর কিভাবে ছিটকে গেলেন সে প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে মান্না বিনয়ের সঙ্গে বলেছেন,“ আমি যতটুকু শুনেছি, আমরা দুজন শিল্পী ছিলাম, দুজন শিল্পীর ভোট সমান হওয়ায় টাই হয়েছিল। জাতীয় পুরস্কারের ব্যাপারে একই ভোট আমরা পেয়েছিলাম। সেখানে আমি অ্যাওয়ার্ডটা পাইনি এটা আমার দুঃখ কিন্তু অভিযোগ নেই। জাতীয় পুরস্কারের স্বীকৃতিটা পেলাম না এই ছবিটার জন্য।”

একটা শ্রেণির দর্শক ছিল যারা মান্নাকে পছন্দ করতো না আম্মাজান মুক্তির পর তারাও পছন্দ করতে শুরু করলো। শুধু তাই নয়, মান্না অ্যাকশন হিরো বলে মহিলাভক্ত অপেক্ষাকৃত কম ছিল। কিন্তু আম্মাজানের পর মান্না পৌঁছে যায় সব শ্রেণির দর্শকের কাছে। মান্না বলেন,“জাতীয়ভাবে এদেশের চলচ্চিত্রের যারা দর্শক, যারা ড্রয়িংরুমেও ছবি দেখে তাদের কাছ থেকে আমি যে প্রশংসা পেয়েছি তাতে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি। এরকম একটা ছবি করে যে দর্শক জনপ্রিয়তা আমি পেয়েছি এতে হাজার হাজার শোকর আল্লাহর কাছে। আমি মনে করি আমার কষ্ট, আমার সাধনা, আমার ধৈর্য্য, সবকিছুর ফল পেয়েছি আম্মাজান ছবিতে।”

আম্মাজান সিনেমার পর মান্নাও উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন তাকে সামাজিক আবেগঘন চরিত্রেও দর্শকরা দেখতে চায়। এরই ধারাবাহিকতায় মান্না পরবর্তীতে স্বামী স্ত্রীর যুদ্ধ, দুই বধু এক স্বামীর মতো অসংখ্য সুপারহিট ব্যবসা সফল সিনেমা উপহার দিয়ে গিয়েছেন।

কাজী হায়াতের “আম্মাজান” ছিল সামাজিক ও পারিবারিক আবেগঘন এক চিত্রনাট্যের সফল রুপায়ন। যেখানে মান্না নিখুঁত অভিনয় করে সকলের মন জয় করতে পেরেছিলেন। মান্নার চরিত্রটি ছিল এক দাগী সন্ত্রাসী, যার মা, ছেলের সাথে কথা বলেন না! আবার ছেলে মায়ের কথার বাইরে কোন কাজও করতে পারেন না। আম্মাজান ছবিতে মান্নার কন্ঠ, চোখ, দেহভঙ্গি ও সংলাপ-সবকিছুই ছিল বাস্তবের মতো আর আবেগে পরিপূর্ণ! গোটাদেশজুড়ে আম্মাজান নিয়ে মাতামাতি, কান্না, হাততালি এমনকি বিদেশেও ছবিটি ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল!

অন্যদিকে “শ্রাবন মেঘের দিন” সিনেমায় অভিনয়ের জন্য জাহিদ হাসান প্রশংসিত হয়েছিলেন। তবে তুলনামুলকভাবে “আম্মাজান”-এর প্রভাব ছিল অনেক বেশি গভীর ও ব্যাপক। সেই সময় অনেক মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, সিনিয়র সাংবাদিক এবং চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট অনেকে সেরা অভিনেতার পুরস্কারের বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন।

“আম্মাজান” সিনেমায় মান্নার অভিনয় আজও দর্শকরা ভোলেননি। আজও টেলিভিশনে এই ছবিটি দেখানো হলে চায়ের স্টলে মানুষরা ভিড় করেন। ইউটিউবে এ প্রজন্মের অনেকে আম্মাজান ছবিটি দেখছেন। নিঃসন্দেহে মান্নার ক্যারিয়ারে অন্যতম সেরা ছবি আম্মাজান। কিন্তু জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি না পাওয়ায় একবুক আক্ষেপ নিয়ে ওপারে চলে গিয়েছেন মহানায়ক মান্না। রেখে গিয়েছেন অনবদ্য সব কাজ, অভিনয় আর ভালোবাসা- যা এদেশের মানুষ কখনো ভুলতে পারবেন না।

Leave a Comment