রুপালি ডেস্ক: স্ত্রীর মৃত্যু বদলে দিয়েছিল কিংবদন্তি নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের জীবনের গতিপথ। ১৯৯৩ সালে এক সড়ক দূর্ঘটনায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিলেন ইলিয়াস কাঞ্চনপত্নী জাহানারা কাঞ্চন। তারপর শুধু রুপালি পর্দায় নয় সত্যিকারের নায়ক হয়ে উঠেন তিনি।
১৯৯৩ সালের অক্টোবরে বান্দরবানে শুটিং করতে গিয়েছিলেন ইলিয়াস কাঞ্চন। সেটি ছিল তার দ্বিতীয়বার বান্দরবান যাওয়া। প্রথমবার শুটিং থেকে এসে সেখানকার নৈসর্গিক দৃশ্যের কথা স্ত্রী জাহানারার কাছে বর্ণনা করেন ইলিয়াস কাঞ্চন। কিন্তু দুই বাচ্চার পরীক্ষার কথা ভেবে ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী দ্বিতীয়বারও স্বামীর সঙ্গী হতে পারেননি। এর ৭দিন পর ১৭ অক্টোবর জাহানারা কাঞ্চন স্বামীকে ফোন দিয়ে বান্দরবান যাওয়ার কথা বলেন। পরিবারকে কাছে পাবেন ভেবে কাঞ্চন খুশি হয়েছিলেন।
বান্দরবান যাত্রার দিনে ইলিয়াস কাঞ্চনের পরিবারের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামানের পরিবার। বয়সে বড় হলেও এটিএম শামসুজ্জামানের সঙ্গে ইলিয়াস কাঞ্চনের সঙ্গে ছিল দারুণ সখ্যতা। পথে ড্রাইভারকে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাতে দেখে বারবার সতর্ক করেছিলেন জাহানারা কাঞ্চন। মাইক্রোবাসের শেষের সারিতে বসেছিলেন ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী। দূর্ঘটনার সময় চালক মাইক্রোবাসটি ঘোরানোর সময় একটি ট্রাক পেছন থেকে ধাক্কা দেয়।
সেই ঘটনার বিবরণ দিয়ে এক সাক্ষাৎকারে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেছিলেন,“ এর আগেও আমরা সিলেটে গিয়েছি। ড্রাইভার আমাদের পরিচিত ছিল। ড্রাইভার আগের রাতে অন্য জায়গায় ডিউটি করেছে। সারারাত গাড়ি চালিয়ে সকালে আমার বাসা থেকে স্ত্রী-বাচ্চাদের নিতে বান্দরবান রওনা দেয়। ড্রাইভার জোরে চালাচ্ছিলো। আমার স্ত্রী বারবার সাবধান করছিল। চালকের পেছনের দিকে একেবারে পেছনের সিটে বসেছিল আমার স্ত্রী। দুর্ঘটনার সময় চালক মাইক্রোবাস ঘুরানোর চেষ্টা করলে ট্রাক সরাসরি এসে আমার স্ত্রী বরাবর আঘাত করে।”
সেবারই বিস্কুট বানানো শিখেছিলেন জাহানারা কাঞ্চন। বিস্কুট বানিয়ে স্বামীর জন্য বান্দরবান নিয়ে যাচ্ছিলেন জাহানারা। দূর্ভাগ্য ইলিয়াস কাঞ্চনের, স্ত্রীর তৈরি করা সেই বিস্কুট আর খাওয়া হয়নি। তার জীবন যেন উপন্যাসের মতোই। ইলিয়াস কাঞ্চনের ভাষায়,“ উপন্যাসের মতোই আমার জীবন। অনেক উপন্যাস পড়তাম। শরৎচন্দ্রের বই। জীবনকে বিভিন্নভাবে দেখতে চেয়েছিলো জাহানারা। মানুষের চাওয়া পূরণ হয়না। শরৎচন্দ্রের গল্পে বিয়োগান্তক বিষয় বেশি থাকে। ঘটনাবহুল আমার জীবন।”
স্ত্রীর মৃত্যুর পর ভেঙে পরেন ইলিয়াস কাঞ্চন। অভিনয়কে বিদায় বলতে চেয়েছিলেন ছোট দুই বাচ্চার কথা চিন্তা করে। কিন্তু অনেক ভেবেচিন্তে সে পথ মাড়াননি। অভিনয় নিয়মিত করে গিয়েছেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনে। এখনও সেটি অব্যাহত রয়েছে। ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ এখন জাতীয় স্লোগানে পরিণত হয়েছে।
জীবনের প্রথম ছবি বসুন্ধরাতে অভিনয়ের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। এ জন্য ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’উপন্যাসটি তাকে বারবার পড়তে হয়েছে। শুধু তাই নয় আর্ট কলেজে তিন মাস ক্লাস করতে হয়েছে। ইলিয়াস কাঞ্চনের পরিচিতির ক্ষেত্রে বসুন্ধরা দারুণভাবে সাহায্য করেছে। এরপর সুপার-ডুপার হিট হয় “আঁখি মিলন” ছবির “আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে” গানটি এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। “ভেজা চোখ” ছবির “জীবনের গল্প, আছে বাকি অল্প” গানটিও দর্শকের মনে ঠাঁই করে নিয়েছে। তারপর“মাটির কসম”, “নীতিবান”,সিপাহী’ “সহযাত্রী”, “প্রেম প্রতিজ্ঞা”, “বেদের মেয়ে জোসনা”, “গাড়িয়াল ভাই”, “বাঁচার লড়াই”, “খুনি আসামিসহ অসংখ্য সুপারহিট-বাম্পারহিট ছবিতে অভিনয় করেছেন ইলিয়াস কাঞ্চন।’দুটি ছবি তিনি পরিচালনা করেছেন। ‘বাবা আমার বাবা’ ও ‘মায়ের স্বপ্ন’।
তবে অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চনকে ছাপিয়ে গিয়েছে নিরাপদ সড়ক চাই এর ইলিয়াস কাঞ্চন। দেশব্যাপী এই আন্দোলন তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন। জাহানারা কাঞ্চনের মৃত্যুর দিন অর্থাৎ ২২ অক্টোবর প্রতিবছর পালন করা হয় ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ দিবস হিসেবে।