শুটিংয়ের বাহিরে অবসর সময় যেভাবে কাটাতেন নায়ক আলমগীর…

ফারহান তানভীর :

বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি দিনগুলোর কথা উঠলেই যে কয়েকজন তারকার নাম প্রথম সারিতে চলে আসে, তাদের মধ্যে চিত্রনায়ক আলমগীর নিঃসন্দেহে অন্যতম।তিনি ছিলেন এক সময়ের সেই পর্দা কাঁপানো নায়ক, যার চোখের চাহনি আর সংলাপ বলার ভঙ্গিতে মুগ্ধ হয়ে থাকত পুরো এক প্রজন্ম। তবে অভিনয়ের বাইরেও আলমগীরের ছিল অন্য পরিচয়। তিনি একজন আড্ডাবাজ, প্রাণখোলা মানুষ এবং সবচেয়ে বড় কথা, একেবারে খাঁটি ভোজনরসিক। তাঁর জীবনের এমন কিছু ছোট ছোট ঘটনা আছে-যেগুলো শুধু গল্প নয়, বরং কিছু সময়ের জীবন্ত দলিল। তেমনই এক মজার ও স্মরণীয় ঘটনার কথা জানা যায় তাঁর এক সাক্ষাৎকারে।

ছবিতে নায়ক আলমগীর

আলমগীরের বলা সেদিনের ঘটনা শুরু হয় এফডিসির এক সাধারণ আড্ডা থেকে। শুটিং না থাকলে আলমগীর প্রায়ই এফডিসিতে সময় কাটাতেন আর সেই আড্ডাগুলোতে প্রায়ই সঙ্গী হতেন দেশের কিংবদন্তি গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার, সুরকার আলাউদ্দিন আলী এবং আজাদ পিকচার্সের মালিক শাহাবুদ্দিন সাহেব। আলমগীর জানিয়েছিলেন এফডিসি ছাড়া তিনি কোথাও আড্ডাই দিতেন না।৷ সেদিন চারজন মিলে অনেক গল্প, হাসি-ঠাট্টা চলছিল-সব মিলিয়ে জমজমাট পরিবেশ। হঠাৎ করেই আলাউদ্দিন আলী জিজ্ঞাসা করেন, “আপনার গাড়িতে তেল আছে?” প্রশ্নটি শুনে আলমগীর উত্তর দেন, “হ্যাঁ, আছে।” এরপরই আলাউদ্দিন আলী বললেন-চলেন, কোথাও থেকে ঘুরে আসি।

ছবিতে আলাউদ্দিন আলী

আলমগীর কিংবা আলাউদ্দিন আলী কেউই জানতেন না কোথায় যাবেন, তাদের কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। একেবারে হুট করেই চারজন গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন গন্তব্যহীন এক যাত্রায়। চলতে চলতে কিছুক্ষণ পর সিদ্ধান্ত হলো সাভার যাওয়া হবে। গাড়ি ছুটে চলল সাভারের দিকে আর সেখানে পৌঁছে বাজারের ভেতর থেকে দই ও বুন্দিয়া খেয়েছিলেন সবাই। সাধারণ খাবার হলেও কিন্তু তাদের আনন্দটা ছিল অসাধারণ।

শুধু দই আর বুন্দিয়াতেই শেষ নয়, আবার গাড়িতে ওঠার পর গাজী মাজহারুল আনোয়ার,আলমগীরকে বলেছিলেন, “চলেন, আরিচা যাই।” আবারও কোনো দ্বিধা না করে রওনা হয়ে গেলেন সবাই। আরিচায় পৌঁছে তারা একসাথে মাছ, মাংস আর ভাত জমিয়ে খেয়েছিলেন। সেই সময় তাদের মোট বিল হয়েছিল মাত্র ৭২ টাকা, যা আজকের হিসাবে খুবই সামান্য মনে হলেও তখনকার প্রেক্ষাপটে ছিল বেশ বড় অঙ্কের টাকা। তবে বিষয়টা তো টাকার নয় বরং সেই মুহূর্তের আনন্দই ছিল আসল বিষয়।

ছবিতে গাজী মাজহারুল আনোয়ার

তবে আলমগীরের এই গল্পের সবচেয়ে মজার অংশটি ঘটেছিল ফেরার পথে। মিরপুর দিয়ে যাওয়ার সময় রাস্তার পাশে একটি গরুর মাংসের দোকান পড়ত। সেখান দিয়ে যাওয়ার সময় আলমগীররা হাতের ইশারায় বলে দিতেন কতটা মাংস প্রস্তুত রাখতে হবে। সেদিন চারজন একসাথে যাচ্ছিলেন বলে আলমগীর নখ দিয়ে ‘১’ ইশারা করেছিলেন-মানে পুরো একটি গরু প্রস্তুত রাখতে হবে! আরিচা থেকে ফেরার সময় তারা চারজন মিলে সেই পুরো গরুর মাংস ভাগ করে নিয়ে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যান।

ছবিতে নায়ক আলমগীর

আলমগীরের এই ঘটনাটি শুধুমাত্র একটি খাওয়াদাওয়ার গল্প বললে ভুল বলা হবে।এই ঘটনাগুলো একেকটা স্বাক্ষী-যারা সাক্ষী দেয় যে একটা সময় চলচ্চিত্রের সবার মাঝে কতটা বন্ধুত্ত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল!নিজ নিজ কাজের ধরণ আলাদা হলেও সবার মাঝেই আন্তরিকতা ছিল অসামান্য। বর্তমান সময়ের শিল্পীদের মাঝে এই আন্তরিকতা চোখে পড়েনা।বরং হাতে ফোন নিলেই দেখা যায় একজন আরেকজনকে ছোট করে কথা বলছেন।নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় সম্প্রিতির কথা হয়তো ভুলেই গেছেন তারা।