সিনেমা হল বাড়ানোর ব্যাপারে যা বললেন আমির খান…

ফারহান তানভীর :

বলিউডের সাম্প্রতিক আলোচিত সিনেমা ‘ধুরন্ধর’ প্রায় এক হাজার কোটি টাকা আয়ের মাইলফলক স্পর্শ করার পর শুধু দর্শকপ্রিয়তা নয়, ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই আলোচনায় বিশেষ মাত্রা যোগ করেছেন বলিউডের সুপারস্টার আমির খান। এক মন্তব্যে তিনি বলেন, ‘ধুরন্ধর’ প্রায় এক হাজার কোটি টাকা আয় করেছে। এখন ভাবুন, যদি সিনেমাটি পাঁচ হাজার নয়, পনেরো হাজার পর্দায় মুক্তি পেত, তাহলে কী হতো? ভারতের বহু জেলায় এখনো সিনেমা হলই নেই।এই বক্তব্য শুধু একটি সিনেমার সাফল্যের প্রশংসা নয়, বরং ভারতীয় চলচ্চিত্র ব্যবসার গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার দিকে সরাসরি ইঙ্গিত। ‘ধুরন্ধর’ মুক্তির পর থেকেই বক্স অফিসে ঝড় তুলেছে এবং অল্প সংখ্যক পর্দায় মুক্তি পেয়েও বিপুল দর্শক টেনেছে। কিন্তু আমির খানের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ-ভারতের মতো বিশাল জনসংখ্যার দেশে একটি সিনেমা কি তার পূর্ণ বাজারে পৌঁছাতে পারছে?

ছবি : বলিউড হাঙ্গামা

ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় চলচ্চিত্র বাজার হলেও বাস্তবতা হলো, দেশের বহু জেলা ও গ্রামীণ অঞ্চলে আধুনিক সিনেমা হল নেই। অনেক জায়গায় একক পর্দার হল বিলুপ্তির পথে, আবার কোথাও পুরোপুরি হলবিহীন। ফলে বড় বাজেটের সিনেমা হলেও দেশের বড় অংশের দর্শক প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে সিনেমা দেখার সুযোগ পায় না। ডিজিটাল মাধ্যমে সিনেমা দেখা গেলেও প্রেক্ষাগৃহভিত্তিক আয়ের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয় না।বক্স অফিস বিশ্লেষকদের মতে, কোনো সিনেমার প্রদর্শনী পর্দার সংখ্যা দ্বিগুণ হলে আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে, বিশেষ করে যদি দর্শকের আগ্রহ বেশি থাকে। ‘ধুরন্ধর’-এর মতো আলোচিত সিনেমা যদি পনেরো হাজার পর্দায় মুক্তি পেত, তাহলে এটি দুই হাজার থেকে তিন হাজার কোটি টাকার আয়ের স্তরেও পৌঁছাতে পারত বলে অনেকের ধারণা। অর্থাৎ, ভারতের চলচ্চিত্র শিল্প শুধু গল্প, তারকা বা প্রচারের ওপর নয়, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণেও বিশাল সম্ভাব্য আয় হারাচ্ছে।

ছবি : ইউটিউব

‘ধুরন্ধর’-এর সাফল্যের পেছনে শক্তিশালী অভিনয়শিল্পী নির্বাচনও বড় ভূমিকা রেখেছে। সিনেমাটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন রণবীর সিং, যিনি এই ছবির মাধ্যমে নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় সাফল্য পেয়েছেন। তার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা গেছে সঞ্জয় দত্ত, আর মাধবন, অক্ষয় খান্না ও অর্জুন রামপালের মতো অভিজ্ঞ অভিনেতাদের। এত বড় এবং বৈচিত্র্যময় অভিনয়শিল্পীদের একসঙ্গে একটি গুপ্তচরভিত্তিক থ্রিলার সিনেমায় দেখা বলিউডে তুলনামূলক বিরল, যা দর্শকদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ ও প্রত্যাশা তৈরি করেছে।চলচ্চিত্র বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অভিনয়শিল্পী নির্বাচন ছিল একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। একদিকে রণবীর সিংয়ের জনপ্রিয়তা ও তরুণ দর্শকদের আকর্ষণ, অন্যদিকে সঞ্জয় দত্ত ও আর মাধবনের মতো অভিনেতাদের অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা-এই সমন্বয় সিনেমাটিকে একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্লকবাস্টার এবং গম্ভীর রাজনৈতিক থ্রিলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

বড় কাস্ট মানেই বড় বাজেট কিন্তু একই সঙ্গে বড় উদ্বোধনী আয় এবং বিস্তৃত দর্শকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর সুযোগ-যা ‘ধুরন্ধর’-এর ক্ষেত্রে পুরোপুরি কাজ করেছে।এই প্রসঙ্গে আমির খানের মন্তব্য আসলে একটি বড় শিল্পগত সতর্কবার্তা। যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের মতো দেশে জনসংখ্যার তুলনায় সিনেমা প্রদর্শনের পর্দার সংখ্যা অনেক বেশি, ফলে বড় বাজেটের সিনেমা দ্রুত সর্বোচ্চ বাজারে পৌঁছে যায়। ভারতে সেই সুযোগ সীমিত। ফলে বলিউডের এক হাজার কোটি টাকার সিনেমা ভবিষ্যতে অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে পাঁচ হাজার কোটির বাস্তবতায় রূপ নিতে পারে-এই সম্ভাবনাই আমির খান তুলে ধরেছেন।

ছবি : আইএমডিবি

এদিকে ‘ধুরন্ধর’-এর সাফল্যের ধারাবাহিকতায় নির্মাতারা সিক্যুয়েল নিয়েও বড় পরিকল্পনা নিয়েছেন। ঘোষণা অনুযায়ী, ‘ধুরন্ধর ২’ মুক্তি পাবে ২০২৬ সালের ১৯ মার্চ। প্রথম সিনেমার রাজনৈতিক থ্রিল, গুপ্তচর কাহিনি ও বিতর্কিত বিষয়বস্তু সিক্যুয়েল নিয়ে দর্শকদের প্রত্যাশা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। চলচ্চিত্র বাণিজ্য বিশ্লেষকদের ধারণা, দ্বিতীয় পর্বে প্রদর্শনী পর্দার সংখ্যা বাড়ানো গেলে এটি আগের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস তৈরি করতে পারে।

ছবি : নেটফ্লিক্স

‘ধুরন্ধর’ তাই শুধু একটি সফল সিনেমা নয়; এটি ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পের সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনার প্রতীক। আমির খানের মন্তব্য দেখিয়ে দিয়েছে, কনটেন্ট, তারকা ও প্রচারের পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়নই হতে পারে বলিউডের পরবর্তী বড় পরিবর্তনের চাবিকাঠি। আর ২০২৬ সালের মার্চে ‘ধুরন্ধর ২’ মুক্তি পেলে, সেই সম্ভাবনার বাস্তব পরীক্ষা শুরু হবে-ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্প কতটা বড় হতে পারে, তারই এক নতুন অধ্যায় লিখতে পারে এই ধারাবাহিক সিনেমা।