ভিলেন হিসেবে যে সিনেমা দিয়ে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন রাজিব…

ফারহান তানভীর :

বাংলা সিনেমায় ভিলেন মানেই এক সময় ছিল চিৎকার, অতিনাটক আর কৃত্রিম ভয় দেখানো। কিন্তু নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দাঙ্গা নামের একটি সিনেমা সেই ধারণায় বড় ধরনের ফাটল ধরায়। আর সেই ফাটলের ভেতর দিয়েই ধীরে কিন্তু দৃঢ়ভাবে উঠে আসেন রাজিব-একজন ভিলেন, যিনি ভয় দেখাননি বরং ভয় হয়ে উঠেছিলেন।দাঙ্গা মুক্তির আগে রাজিব ইন্ডাস্ট্রিতে অপরিচিত ছিলেন না। কিন্তু এই ছবির আগ পর্যন্ত তিনি ভিলেন হিসেবে নিজের একটি স্থায়ী জায়গা তৈরি করতে পারেননি।

ছবি : ইউটিউব

কাজী হায়াত পরিচালিত দাঙ্গা সেই জায়গাটা শুধু তৈরি করেই দেয়নি বরং রাজিবকে বাংলা সিনেমার ভিলেনদের এক আলাদা সারিতে দাঁড় করিয়ে দেয়। এই ছবিতে তার চরিত্র ছিল নির্মম, ঠান্ডা মাথার অথচ অস্বস্তিকরভাবে বাস্তব-যেটা দর্শকের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর।এই বাস্তবতাকে আরও ধারালো করে তুলেছিল রাজিবের লুক ও কস্টিউম। লুঙ্গি, খাকি রঙের শার্ট আর মুখভর্তি দাড়ি-এই সাজটা কোনো গ্ল্যামারাস ভিলেনের নয় বরং একেবারে রাস্তাঘাটের, চেনা এক অপরাধীর। বিশেষ করে যখনই সে খুন করতো বা একশনে যেত, তখন লুঙ্গি খুলে মাথায় বেঁধে নেওয়ার ভিজ্যুয়ালটা দর্শকের মনে আলাদা উত্তেজনা তৈরি করতো। এই ছোট্ট ডিটেইলটাই চরিত্রটাকে আইকনিক করে তোলে আর দর্শকও এই মুহূর্তগুলো দারুণভাবে উপভোগ করতো।

ছবি : ইউটিউব

এই উত্থানের পেছনে একটি বড় ভূমিকা রেখেছেন মান্নাও। দাঙ্গা সিনেমায় মান্নার উপস্থিতি ছিল শক্ত, প্রতিবাদী এবং আগ্রাসী। আর ঠিক এই শক্ত নায়কের বিপরীতে রাজিবকে দাঁড় করানোই ভিলেন চরিত্রটাকে আরও ভয়ংকর করে তোলে। মান্নার চোখে চোখ রেখে রাজিব যেভাবে সংলাপ বলতেন, যেভাবে শান্ত গলায় হুমকি দিতেন-সেটা প্রমাণ করে, এই ভিলেন নায়ককে ভয় পায় না। বরং সমান শক্তির প্রতিপক্ষ হিসেবেই নিজেকে তুলে ধরে।রাজিবের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার সংযম। তিনি অকারণে গলা চড়াননি, অযথা চোখ লাল করেননি। বরং তার ভয়েস, সংলাপ বলার ধরন আর মুখের অভিব্যক্তি মিলিয়ে এমন এক আতঙ্ক তৈরি করেছিলেন, যা তখনকার দর্শক অভ্যস্ত ছিল না।

ছবি : ইউটিউব

দাঙ্গা সিনেমায় বলা তার বিখ্যাত সংলাপ-“আমি মাইন্ড করলাম”, “আমি খুবই মাইন্ড করলাম”, কিংবা “ওসি, মাইন্ড করলে না তো?”-এই লাইনগুলো আসলে বড় কোনো সাহিত্যিক সংলাপ ছিল না। কিন্তু রাজিবের উচ্চারণে এগুলো হয়ে উঠেছিল হুমকি, হয়ে উঠেছিল অশনি সংকেত।এই সংলাপের প্রভাব সিনেমার পর্দা ছাড়িয়ে চলে যায় বাস্তব জীবনে। সেই সময় কারো ওপর রাগ হলে, মন খারাপ হলে বা ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়েও মানুষ মজা করে বলতো-“আমি মাইন্ড করলাম।” একটি সিনেমার সংলাপ যখন মানুষের দৈনন্দিন কথাবার্তার অংশ হয়ে যায়, তখন বুঝতে হয় সেটি কতটা গভীরে ঢুকে গেছে। দাঙ্গা-র এই ডায়লগই প্রমাণ করে, রাজিব শুধু দৃশ্য দখল করেননি, তিনি ভাষাও দখল করেছিলেন।এই জনপ্রিয়তার প্রভাব পড়ে পুরো ইন্ডাস্ট্রিতে। দাঙ্গা-র পর থেকেই প্রায় সব সিনেমায় চেষ্টা করা হতো এমন কিছু ডায়লগ ঢোকাতে, যেগুলো মানুষের মুখে লেগে থাকবে। ভিলেন হোক বা নায়ক-একটা “ক্যাচি লাইন” যেন বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে। সেই ধারার সূচনালগ্নে দাঙ্গা আর রাজিবের নাম আলাদা করে উচ্চারিত হয়।

ছবি : ইউটিউব

এই অভিনয়ের স্বীকৃতিও আসে দ্রুত। দাঙ্গা সিনেমায় রাজিবের পারফরম্যান্সের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন, যা প্রমাণ করে-এটা শুধু দর্শকের ভালোবাসা নয়, ইন্ডাস্ট্রির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও। এখান থেকেই রাজিব নিয়মিত শক্তিশালী ভিলেন চরিত্রে কাস্ট হতে শুরু করেন।আজ অনেক বছর পরেও যখন বাংলা সিনেমার স্মরণীয় ভিলেনদের কথা ওঠে, দাঙ্গা আর রাজিবের নাম একসঙ্গে আসে। কারণ এই ছবিটা শুধু একটি সফল সিনেমা ছিল না; এটি ছিল রাজিবের ভিলেন হিসেবে উত্থানের মঞ্চ। লুঙ্গি বাঁধা সেই মানুষটা, শান্ত গলায় বলা সেই সংলাপ-সব মিলিয়ে রাজিব প্রমাণ করেছিলেন, ভিলেন হতে হলে ভয় দেখাতে হয় না, ভয় হয়ে উঠলেই যথেষ্ট।