ফারহান তানভীর :
ঢালিউডের আকাশে যাঁরা নায়ক হয়ে জন্ম নেন, তাঁদের সংখ্যা হয়তো অনেক। কিন্তু নায়ক হয়েও যাঁরা বাস্তব জীবনে কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন-তাঁদের নাম খুব কম। সেই কম নামের তালিকায় প্রথম সারিতে থাকবেন একজন মানুষ… প্রয়াত কিংবদন্তি নায়ক জসীম।

মাসের পর মাস শুটিং নিয়ে ব্যস্ত থাকা সেই জসীম হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাল যে তাঁর হার্টের অপারেশন করতে হলো। ডাক্তাররা বললেন-বিশ্রাম নিতে হবে, দীর্ঘ বিশ্রাম।শুটিং বন্ধ। ক্যামেরা বন্ধ। আলো নিভে যাওয়া সেটের দিকে তাকিয়ে নীরব হয়ে গেলেন প্রযোজক-পরিচালকরা। সবাই শুধু একটাই কথা বলছিল- “জসীম ভাই পুরোপুরি সুস্থ হোক, তারপরই শুটিং।”

কিন্তু জসীম? তিনি তো আর সাধারণ মানুষ নন। সিনেমা তাঁর শ্বাস, সিনেমা তাঁর হৃদস্পন্দন। অপারেশনের মাত্র ২০ দিন পরই জসীম আবার দাঁড়িয়ে গেলেন লাইট–ক্যামেরার সামনে।হয়তো অন্য কেউ হলে একটি সাধারণ দৃশ্য দিয়েই শুরু করতেন। কিন্তু জসীম তা করলেন না।শুটিং শুরু হলো… ফাইটিং দৃশ্য দিয়ে! আর শুধু ফাইটিং না-সিনেমার ক্লাইম্যাক্স! যে দৃশ্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে পুরো ছবির বিশ্বাসযোগ্যতা।

পরিচালক থেকে শুরু করে ইউনিটের সবার মুখে তখন একই কথা- “ধীরে করো জসীম ভাই, সময় নিয়ে করো।” কিন্তু জসীম হাসিমুখে উত্তর দিলেন, “একঘেয়েমি লাগে বসে থাকতে… শুটিংটাই আমার অক্সিজেন।”এই দৃশ্যে তাঁর সাথে ছিলেন ঢালিউডের কিংবদন্তি খলনায়ক আহমেদ শরীফ। শুরু থেকেই তিনি আতঙ্কে ছিলেন। “যদি ভুল করে একটু আঘাত লাগে? যদি কিছু হয়ে যায়?”ফাইটের শট শুরু হলো। এক ঘুষি। দুই ঘুষি। তারপর খুবই হালকা ভাবে আরেকটা ঘুষি মারলেন আহমেদ শরীফ-জসীমের পেটে। সেই ঘুষি হতেই, “এই! কাট কাট!” -বলে উঠলেন জসীম।হতভম্ব হয়ে গেলেন আহমেদ শরীফ। মনে হলো-‘গেলাম! এমন কিছু করলাম নাকি, যেটা তাঁর অপারেশনের জায়গায় লেগে গেল?’

কিন্তু কাছে এসে জসীম যা বললেন, তা শুনে তিনি রীতিমতো অবাক, “আজকে কি আপনার শুটিংয়ের মুড নাই? দরকার হলে প্যাকআপ করে দিই।”হালকা ঘুষি নাকি! জসীম বললেন, “আপনার ঘুষি তো বাতাসও লাগেনি! আমরা তো সিরিয়াস ফাইট করতাম। জোরে লাগত, খুব জোরে।” উদ্বেগ–ভালোবাসায় ডুবে থাকা আহমেদ শরীফ তখন বললেন, “কদিন আগে অপারেশন হল… তাই জোরে মারতে খারাপ লাগছে।” কিন্তু জসীম? তিনি এক কথায় সব উড়িয়ে দিলেন, “শুটিংয়ে কোনো ছাড় নেই। অপারেশন ভুলে যান। পূর্ণ শক্তিতে মারবেন।”তারপর শুরু হলো আসল ফাইট। ঘুষির পর ঘুষি-যেন সত্যিকারের যুদ্ধ! একসময় হাসতে হাসতেই জসীম বললেন, “শ্বশুর, এখন ঠিক আছে… এইভাবে মারেন।”

জসীম খুশি ছিলেন। কারণ তিনি অপারেশনের পরেও নিজের ১০০% দিতে পেরেছেন। কারণ তিনি জানতেন, সিনেমা হলো তাঁর প্রতি প্রতিটি দর্শকের ভালোবাসার ঋণ।তাই তো আজও বলা হয়, জসীম শুধু পর্দার নায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন সিনেমার জন্য পাগল একটি আত্মা। যে আত্মার জন্যই জসীম-আহমেদ শরীফ জুটি পরিণত হয়েছে ঢালিউডের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়ে।