২৯ বছরের লড়াইয়ের পর অবশেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন সালমান শাহ’র মা নীলা চৌধুরী…

ফারহান তানভীর :

দীর্ঘ ২৯ বছরের লড়াই, অসংখ্য অপমান, আর একাকী অপেক্ষার পর অবশেষে আদালতের নির্দেশে সালমান শাহ হত্যার মামলার কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। এই খবর শুনে যেন নতুন করে নিশ্বাস নিতে পারলেন প্রয়াত নায়কের মা নীলা চৌধুরী। লন্ডন থেকে প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বললেন, “আমার শরীর-মন খালি খালি লাগছে। ছেলেকে মার্ডার করা হয়েছে, মামলা হচ্ছে-এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে অবশেষে ন্যায়বিচার পাব, এটাই স্বস্তির।”

সালমান শাহ। ছবি – বাংলা টকিজ

বাংলা সিনেমার আকাশে ক্ষণজন্মা নক্ষত্র সালমান শাহর মৃত্যু যেন এক রহস্যে ঘেরা অধ্যায়। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ইস্কাটনের ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয় তাঁর নিথর দেহ। দীর্ঘদিন সেটিকে আত্মহত্যা বলে চালানো হলেও নীলা চৌধুরীর বিশ্বাস ছিল শুরু থেকেই-এটা খুন। তাই তিনি পেছনে ফেরেননি এক মুহূর্তের জন্যও। “এই ২৯ বছর মানুষ আমাকে খারাপ বলেছে, আমার ছেলেকেও খারাপ বলেছে। কেউ বলেছে আমি নাকি ওকে মেরেছি। তবুও আমার বিশ্বাস ছিল, একদিন আইনে প্রমাণ হবে এটা খুন,” বললেন তিনি।তাঁর কথায় উঠে আসে অজানা ভয় আর অবিরাম ষড়যন্ত্রের গল্প। নীলা জানান, “মাত্র এক মাস আগেও ডন আমাকে হুমকি দিয়েছে। প্রেসক্লাবের সামনে যেতে বলেছে। চিন্তা করা যায়! যে আমার ছেলের পেছনে ঘুরত, সে আজ আমাকে ভয় দেখায়।” তাঁর বিশ্বাস, বড় বড় মাফিয়া ও অর্থবলয় সবসময়ই চেয়েছিল সত্যটা চাপা পড়ে থাকুক। “

সালমান শাহ। ছবি – বাংলা ফোরাম

আজিজ মোহাম্মদ টাকা খরচ করে মিডিয়াকে ব্যবহার করেছে। সালমানকে দুশ্চরিত্র, লম্পট বানানোর চেষ্টা করা হয়েছিল-যেন মানুষ ভুলে যায়, এটা একটা পরিকল্পিত হত্যা।”তবু থেমে থাকেননি তিনি। ২০০২ সালে হজে গিয়ে আল্লাহর কাছে ন্যায়বিচার চেয়ে এসেছিলেন। সেই প্রার্থনা যেন আজ আংশিকভাবে ফল পেয়েছে। আদালতের নির্দেশ শুনে মনে পড়েছে ছেলের ছোট ছোট অভ্যাস, কথাবার্তা। কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে তাঁর, “সালমান আমাকে ‘নেত্রী’ আর বাবাকে ‘মিস্টার নেগেটিভ’ বলত। রাতে এসে আমার পাশে শুয়ে থাকত। সংসারে অশান্তি ছিল, তবু সে ভীষণ প্রাণবন্ত ছিল। সে বলেছিল, ‘আম্মা, সামিরা নিজেই চলে যাবে। আমার ছাড়ার দরকার হবে না।’ এমন একজন মানুষ আত্মহত্যা করবে-এই কথা আমি মানতে পারি না।”

সালমান শাহ। ছবি – ঢাকা নিউজ

অতীতের দীর্ঘ সময়ে নীলাকে সহ্য করতে হয়েছে অজস্র অপমান ও অবহেলা। তিনি বলেন, “অনেক বিচারক এমন আচরণ করেছেন, যেন আমি কোনো অপরাধী। একবার আদালতের রায় দেওয়া হলো-দুই পক্ষকেই খুশি করার জন্য! এটা কী বিচার? এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও দেখা করতে গিয়ে রাত একটা পর্যন্ত বসে থাকতে হয়েছে। ন্যায়বিচার চাওয়া যেন পাপ ছিল আমার।”তবু এই সব বাধা তাঁকে ভাঙতে পারেনি। “মনোজ কুমার নামে পিবিআইয়ের একজন কর্মকর্তা আমাকে অপদস্থ করেছিল। হাসাহাসি করেছিল। কিন্তু আমি জানতাম, একদিন সত্য প্রকাশ পাবেই,”-বললেন সালমানের মা। তাঁর দাবি, সালমানকে আত্মহত্যা নয়, পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। “

সালমান শাহ। ছবি – নিউজ টুডে

সামিরা চট্টগ্রাম থেকে লোক এনে ইমনকে খুন করায়। সেই বিল্ডিংয়ের অনেক ফ্ল্যাটই ছিল আজিজ মোহাম্মদের নিয়ন্ত্রণে।তারা একসঙ্গে এই কাজ করেছে,” অভিযোগ করেন তিনি।

বর্তমানে লন্ডনে অবস্থানরত নীলা চৌধুরী এখনো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। “আমার ভাই এখন সব সামলাচ্ছে। আমি চাই রাষ্ট্র আমাদের সিকিউরিটি নিশ্চিত করুক। যাদের কারণে বিচার বিলম্বিত হয়েছে, তারা এখনো সক্রিয়। আসামিদের যেন দ্রুত আইনের আওতায় আনা হয়, নইলে তারা পালিয়ে যাবে।”দীর্ঘ নিঃসঙ্গ লড়াইয়ের পরও নীলা চৌধুরীর বিশ্বাস ভাঙেনি।

সালমান শাহের স্ত্রী সামিরা ও মা নীলা চৌধুরী। ছবি – কোলাজ

তাঁর দৃঢ় কণ্ঠে শেষ বাক্য-“আমার ছেলে আত্মহত্যা করার মতো ছেলে না। সে স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে ছিল। আমি জানি, ইনশা আল্লাহ এবার ন্যায়বিচার হবেই।”