জেসমিন জুঁই
“১৯৯৪ সাল…পর্দায় চলছে সাহসী সিপাহীর গল্প… আর বাস্তবে হয়েছে এক অবিচারের ইতিহাস।
ইলিয়াস কাঞ্চনের ‘সিপাহী’ ছিল একটি বিস্ফোরণ। যিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ান,
আর দর্শকদের হৃদয়ে গেঁথে গিয়েছিলেন সত্যিকারের হিরো হয়ে। বলছি ‘সিপাহী’র দেশ প্রেমিক তারকা ইলিয়াস কাঞ্চনের কথা। তাঁর অসাধারণ অভিনয়ে মুগ্ধ ছিল দর্শক, মুগ্ধ ছিল সমালোচকরাও। তবুও… জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ইলিয়াস কাঞ্চনের হাতে ওঠেনি।
কেন? তা আজও এক বিরাট প্রশ্ন।

সেই সময় সামাজিক অসঙ্গতি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্মিত সিনেমাগুলোর বেশিরভাগই নির্মাণ করেছেন কাজী হায়াৎ। ‘সিপাহী’ সিনেমার প্রেক্ষাপট ছিল মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালীন সময়। “সিপাহী” সিনেমাটি যতবারই দেখবেন ততবারই আপনার ভালো লাগবে। কিছু কিছু সিনেমা আছে যেগুলো পুরনো হয় না ‘সিপাহী’ তার মধ্যে অন্যতম। মুক্তিযুদ্ধের সময় আহত আপন ভাইকে নিজ হাতে গুলি করে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেয়ার মত করুন দৃশ্য এই সিনেমায় দেখানো হয়, যা দর্শকের মনে আজও দাগ কেটে আছে। ‘সিপাহী’ সিনেমার শেষ দৃশ্যের অভিনয়ে কিংবদন্তি ইলিয়াস কাঞ্চনকে যারা দেখেছেন তাঁরা কখনই ভুলতে পারবেননা তার অভিনয় দক্ষতাকে।

ইলিয়াস কাঞ্চন অভিনয় করেছিলেন একজন সৎ পুলিশ অফিসারের চরিত্রে-যিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান এবং নিজের জীবন বাজি রেখে সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ করেন। ইলিয়াস কাঞ্চনের চোখের ভাষা, সংলাপ, দেহভঙ্গিমা-প্রতিটা মুহূর্তে ফুটে উঠেছে চরিত্রের গভীরতা। ‘সিপাহী’ সিনেমায় রাজাকারের চরিত্রে সত্যিকারের রাজাকার মনে হয়েছে আহমেদ শরীফকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের শত্রু ছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর হিরোইন ব্যবসা করে যুব সমাজকে বিপথে ঠেলে দেন। গ্রাম থেকে আসা সহজ সরল ফুলির জীবন নষ্ট করেন আহমেদ শরিফ। এক সময় ফুলি আহমেদ শরিফের হিরোইন ব্যবসার কথা ফাঁস করার চেষ্টা করেন। তার আগেই কাবিলাকে দিয়ে ফুলিকে খুন করান আহমেদ শরীফ। এই খুনের দায় চাপানো হয় রাজু অর্থাৎ মান্নার উপর। কারণ মান্না আহমেদ শরিফের মেয়ে কবিতাকে ভালোবাসতেন।
কবিতাকে ভালোবাসার অপরাধে অবৈধ অস্ত্র মামলায় মান্নাকে জেলও খাটতে হয়েছে। আর জেল থেকে বেরিয়ে মান্না হয়ে যান গুন্ডা, টেরর এবং দাগী আসামী। ইলিয়াস কাঞ্চনের পাশাপাশি পাশ্ব চরিত্রে ‘সিপাহী’ সিনেমায় দুর্দান্ত অভিনয় করেন মান্না। গণমানুষের নায়কের তখনও পায়ের তলার মাটি শক্ত হয়নি। তবে মান্না যে আগামীতে সুপারস্টার হতে চলেছেন ‘সিপাহী’ সিনেমায় সেই স্বাক্ষর তিনি রাখতে পেরেছিলেন। প্রধান চরিত্রে ইলিয়াস কাঞ্চন থাকলেও মান্না স্বতন্ত্রভাবে নিজেকে মেলে ধরেছেন। এই স্বতন্ত্র বৈশিষ্টই পরবতীতে তাকে সুপারস্টার বানিয়েছে।

তবে ‘সিপাহী’ সিনেমা সবাই মনে রেখেছেন ইলিয়াস কাঞ্চনের অসাধারণ অভিনয়ের জন্য। বিশেষ করে সিনেমার শেষ ৩০ মিনিট ইলিয়াস কাঞ্চন জীবনের সেরা অভিনয়টা করে গিয়েছেন এ নিয়ে সন্দেহ নেই! শুরুতে চম্পাকে অনেকটা ফানি মনে হলেও ইলিয়াস কাঞ্চনের চাকরি চলে গেলে সিরিয়াস হয়ে উঠেন চম্পা। একই ছবিতে ফানি এবং কতটা সিরিয়াস অভিনয় করা যায় সেটা দারুনভাবে দেখিয়েছেন চম্পা। বিশেষ করে আদালতে উকিলের চরিত্রে চম্পা অপূর্ব অভিনয় করেছেন।
চাকরি ফিরে পাওয়ার পরেও ইলিয়াস কাঞ্চন পুলিশের পোশাক না পরেও রাজাকার আহমেদ শরীফকে আদালতে হাজির করার প্রতিশ্রুতি দেন। মূলত এখান থেকেই কাজী হায়াতের গল্প করুন পরিণতির দিকে এগোতে থাকে। ইলিয়াস কাঞ্চন কত বড় মাপের অভিনেতা সেটা তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন। চম্পাকে হাসপাতালের বেডে রেখে শ্বশুড় অথাৎ পুলিশের উধ্বতন কর্মকর্তা খলিলের সামনে দেয়া সেই ডায়লগ আপনাকে স্তব্ধ করে দেবে,‘ স্তব্ধ কেন? স্যার আমি সেই কাঞ্চন? ইয়েস আই দ্যাট কাঞ্চন! স্যার, এ আমার দেশকে ভালোবাসার পুরস্কার!” এই ডায়লগ শুনে হলভর্তি দর্শকরা পিনপতন নিরব হয়ে গিয়েছিল।

এরপর আদালতের দৃশ্যে দর্শক হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন ইলিয়াস কাঞ্চনের অভিনয় দেখে। হলভর্তি দর্শকের মনে হচ্ছিল এ ঘটনা তাদের চোখের সামনে ঘটছে। আহমেদ শরীফকে আদালতে হাজির করে ইলিয়াস কাঞ্চন বলতে থাকেন,‘ একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে, একজন সিপাহী হিসাবে দেশের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি আমি রক্ষা করেছি। এই ব্যক্তি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দেশের শত্রু রাজাকার ছিল। এই ব্যক্তি আন্তর্জাতিক চোরাকারবারির সাথে জড়িত। দেশের যুব সমাজকে ধ্বংশ করার জন্য বিষাক্ত হিরোইন ব্যবসায়ীদের সাথে জড়িত। এই ব্যক্তির কু চক্রান্তে একজন দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা আজ বিপথগামী। মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে সে আজ আদালতে কাঠগড়ায় দাড়িয়ে আপনার বিচারের অপেক্ষায়। ইয়োরনা এই ব্যক্তি গ্রামের একটি সহজ সরল নিষ্পাপ মেয়ে ফুলির জীবনকে করেছিল কলঙ্কিত। সেই ফুলিকে এই ব্যক্তির নির্দেশে খুন করে কাবিলা….এই ব্যক্তির নির্দেশে কাবিলা থানা হাজতে খুন করেছে নুরল ইসলামকে। ইয়োরনা ওর সর্বশেষ অপরাধ…আমাকে করেছেন নিঃসন্তান। সেই দুঃখে আমার স্ত্রী গলায় ফাঁসি দিয়ে ফ্যানের সাথে ঝুলছে…! ইয়োরনা এত অপরাধের বিচারের রায় বলুন….বলুন ইয়োরনা…চুপ করে থাকবেন না ইয়োরনা….বলুন….নিশ্চয়ই ফাঁসি…।”

ইলিয়াস কাঞ্চনের অভিনয় দেখে হল ভর্তি মানুষ বাকরুদ্ধ হয়ে যান! আদালতের এজলাসে দাঁড়িয়ে ইলিয়াস কাঞ্চনের অভিনয় দেখে অনেক দর্শক কেঁদে ফেলেন। ইলিয়াস কাঞ্চন বিচারকের উদ্দেশ্যে বলেন,“ আজ আদালত এখানে দুটি। একটি দেশের আইন সম্মত আদালত…একটি মুক্তিযোদ্ধার আদালত! মুক্তিযোদ্ধার আদালতের রায় শুনুন…রাজু বেখুসুর খালাস…দেলোয়ার হোসেন খানের মৃত্যুদন্ড! আপনার আদালত থেকে আমার আদালতের পার্থক্য হলো আপনার আদালতে আপিল করার সুযোগ আছে…আমার আদালতে তা নেই। আমি এক্ষুনি মৃত্যুদন্ড কাযকর করবো।”
‘সিপাহী’ সিনেমা সুপারডুপার হিট হয়েছিল। এই সিনেমাটি দর্শকের ভালোবাসা যেমন পেয়েছিল, তেমনি প্রশংসা পেয়েছে মিডিয়া ও সমালোচকদের কাছ থেকেও। তখন পত্রিকায় শিরোনাম হয়েছিল-“ইলিয়াস কাঞ্চনের এ পর্যন্ত সেরা চরিত্র হতে পারে ‘সিপাহী’।” সিপাহী সিনেমার পর দর্শক ইলিয়াস কাঞ্চনকে দেখতে শুরু করে ‘মানসিকভাবে শক্ত এক সংগ্রামী চরিত্র’ হিসেবে।
‘সিপাহী’ সিনেমায় অনবদ্য অভিনয়ের পরেও জাতীয় পুরস্কার কেন পেলেন না ইলিয়াস কাঞ্চন- এই প্রশ্ন বহু বছর ধরেই ঘুরপাক খাচ্ছে ভক্তদের মনে। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রায়শই এমন সিনেমাকে দেওয়া হয় যেগুলো তথাকথিত “শিল্পধর্মী”। ‘সিপাহী’ ছিল একটি বাণিজ্যিক সিনেমা, কিন্তু এর গভীরতা, বার্তা ও চরিত্রের প্রকাশ ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী।

জুরি বোর্ড সিদ্ধান্ত নেয় কে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাবেন। সেখানে অনেক সময় ব্যক্তি পছন্দ, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভূমিকা রাখে। ১৯৯৪ সালে কাজী হায়াতেরই আরেকটি সিনেমা ‘দেশ প্রেমিক’ মুক্তি পেয়েছিল। যে সিনেমাতে উঠে আসে সেন্সর বোর্ড ও বাংলা সিনেমা নিয়ে লড়াই করা এক চিত্রপরিচালকের জীবন। এই চিত্রপরিচালকের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক আলমগির। তৎকালীন সময়ে ঐরকম ব্যাতিক্রম বিষয় নিয়ে সিনেমা নির্মাণের সাহসিকতা দেখিয়েছেন কাজী হায়াত। দেশ প্রেমিক সিনেমার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান বর্ষিয়ান অভিনেতা আলমগীর। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়-তুলনামূলকভাবে ‘সিপাহী’ সিনেমায় ইলিয়াস কাঞ্চন কি কম যোগ্য ছিলেন?
পুরস্কার না পেলেও ইলিয়াস কাঞ্চনের প্রাপ্তি ছিল অনেক বড়। তিনি পেয়েছেন দর্শকের অফুরন্ত ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা। যা পুরস্কারের চেয়েও অনেক বেশি ছিল। আজও অনেকে ‘সিপাহী’ সিনেমায় ইলিয়াস কাঞ্চনের অনবদ্য অভিনয়ের কথা ভোলেননি। প্রশ্নটা এখন সবার-পুরস্কার কি সত্যিই একজন শিল্পীর প্রকৃত স্বীকৃতি দেয়? নাকি, একজন অভিনেতার সত্যিকারের পুরস্কার হলো-দর্শকের ভালোবাসা, স্মৃতির মাঝে জায়গা করে নেওয়া, আর সময়কে ছুঁয়ে থাকা? ইলিয়াস কাঞ্চনের ‘সিপাহী’ চরিত্রটি যেন সেটাই প্রমাণ করে দিয়েছে।পুরস্কার সবসময় মানদন্ড সেট করতে পারে না…. কিছু পুরস্কার থাকে মনে, যা গেঁথে যায় সারা জীবনের জন্য। ইলিয়াস কাঞ্চনও তাই থাকবেন।