শুধু কমেডিয়ান হিসেবেই নয়,নায়ক হিসেবেও বাজিমাত করেছিলেন দিলদার! কোন সিনেমায় নায়ক ছিলেন তিনি?

ফারহান তানভীর :

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ থাকেন, যাদের উপস্থিতি দর্শককে শুধু হাসায় না-তাদের অনুপস্থিতি দীর্ঘদিন কাঁদায়। অভিনেতা দিলদার ঠিক সেই রকমই একজন শিল্পী। প্রায় তিন দশক ধরে তিনি ছিলেন ঢালিউডের নির্ভরযোগ্য মুখ, এমন একজন অভিনেতা যিনি পর্দায় এলেই দর্শক নিশ্চিত থাকত-কিছু একটা আলাদা দেখার অপেক্ষায় আছে। অথচ সেই মানুষটাই মাত্র ৫৮ বছর বয়সে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। প্রশ্নটা তাই স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে-৫৮ বছর কি একজন শিল্পীর চলে যাওয়ার বয়স?

কৌতুক অভিনেতা দিলদার

দিলদার অভিনয় করেছেন তিন শতাধিক, অনেকের মতে প্রায় পাঁচশোর কাছাকাছি সিনেমায়। এই সংখ্যাটা শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটা প্রমাণ করে তিনি কতটা প্রয়োজনীয় ছিলেন ইন্ডাস্ট্রির জন্য।সালমান শাহ,মান্না,ফেরদৌস,রুবেল,জসিম,আলমগীর, শাকিব খান সহ এমন কোনো নব্বইয়ের নায়ক নেই যার ছবিতে দিলদার ছিলেন না। সে সময় তাঁর জনপ্রিয়তা এতোটাই ছিল যে পরিচালক নায়ক চেঞ্জ করতেন কিন্তু প্রতি ছবিতে দিলদান ছিলেন ধ্রুবকের মতো। কমেডি ছিল তাঁর প্রধান পরিচয়, কিন্তু তিনি কখনোই শুধুমাত্র “হাসির অভিনেতা” হয়ে থাকেননি। চরিত্র যত ছোটই হোক, নিজের অভিনয় দিয়ে সেটাকে স্মরণীয় করে তোলার ক্ষমতা ছিল তাঁর। সংলাপ বলার ভঙ্গি, চোখের অভিব্যক্তি, শরীরী ভাষা-সব মিলিয়ে দিলদার ছিলেন একেবারে নিজস্ব ঘরানার শিল্পী।

কৌতুক অভিনেতা দিলদার

তাঁর জনপ্রিয়তা এতটাই ব্যাপক ছিল যে নব্বই দশকে এসে নির্মাতারা তাঁকে কেবল পার্শ্বচরিত্রে আটকে রাখেননি। সেই জনপ্রিয়তারই বড় প্রমাণ ১৯৯৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘আব্দুল্লাহ’। পরিচালক তোজাম্মেল হক বকুল এই সিনেমায় দিলদারকে নায়ক হিসেবে উপস্থাপন করেন-যা সে সময়ের জন্য ছিল একেবারেই ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত। কারণ তখন কমেডিয়ানদের নায়ক হিসেবে দেখা খুব একটা প্রচলিত ছিল না।‘আব্দুল্লাহ’ সিনেমায় দিলদারের বিপরীতে অভিনয় করেন নায়িকা নূতন। মুক্তির পর ছবিটি ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পায় এবং সে বছরের অন্যতম ব্যবসাসফল সিনেমার তালিকায় জায়গা করে নেয়। সেই সময়েই প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার ব্যবসা করে ছবিটি, যা নব্বই দশকের বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বাজারের প্রেক্ষাপটে ছিল অত্যন্ত বড় সাফল্য। এই সিনেমা প্রমাণ করে দেয়-দিলদার চাইলে পুরো সিনেমার ভার নিজের কাঁধে নিতে পারেন।

আব্দুল্লাহ সিনেমার পোস্টার

তবু দুঃখজনক সত্য হলো, দিলদারের অভিনয় জীবনের পূর্ণ সম্ভাবনা আমরা কখনোই দেখতে পেলাম না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চরিত্রগুলো আরও গভীর, আরও পরিণত হতে পারত। চরিত্রাভিনেতা হিসেবে তিনি যে উচ্চতায় পৌঁছাতে পারতেন, সেই পথটাই যেন হঠাৎ থেমে গেল। দর্শকদের মনে থেকে গেল এক আক্ষেপ-দিলদারের সেরা অভিনয়টা হয়তো এখনও বাকি ছিল।

কৌতুক অভিনেতা দিলদার

২০০৩ সালে তাঁর চলে যাওয়ার খবর শুধু চলচ্চিত্র অঙ্গন নয়, সাধারণ দর্শকদের মাঝেও গভীর শোকের ছায়া নামিয়ে আনে। কারণ দিলদার ছিলেন ঘরের মানুষ, নিজের মানুষের মতো একজন শিল্পী। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি মানেই ছিল নির্ভরতা, স্বস্তি আর প্রাণখোলা হাসি।আজ দিলদার নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি করা চরিত্রগুলো রয়ে গেছে। রয়ে গেছে তাঁর সংলাপ, তাঁর অভিনয়ের মুহূর্তগুলো, আর রয়ে গেছে এক শূন্যতা-যেটা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। বাংলাদেশের সিনেমাজগৎ হয়তো নতুন অভিনেতা পাবে, কিন্তু আরেকজন দিলদার পাবে না। কারণ সত্যিই-দিলদারদের শূন্যতা কখনও পূরণ হয় না।