ফারহান তানভীর :
ভারতীয় বিনোদন জগতের সবচেয়ে পরিচিত মুখগুলোর একটি শাহরুখ খান। সিনেমার পর্দায় যেমন তিনি আবেগ, প্রেম আর মানবিকতার প্রতীক, ঠিক তেমনি আইপিএলের মঞ্চে কলকাতা নাইট রাইডার্সের মালিক হিসেবেও তিনি আলাদা এক পরিচয় গড়ে তুলেছেন। কিন্তু সেই শাহরুখ খানই এবার জড়িয়ে পড়েছেন এক অস্বস্তিকর বিতর্কে। কারণ, আইপিএল নিলামে নয় কোটি রুপিতে বাংলাদেশের তারকা পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে দলে ভেড়ানো। একটি ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্ত কীভাবে এত বড় রাজনৈতিক ও আদর্শিক ঝড় তুলতে পারে, সেটাই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

মুস্তাফিজুর রহমান আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সুপরিচিত নাম। এর আগেও তিনি আইপিএলে খেলেছেন, ভারতীয় দর্শকের কাছে নতুন নন। তবুও এবার তাকে নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র আপত্তি। ভারতের কিছু ডানপন্থী ও কট্টর সংগঠন প্রকাশ্যে দাবি তুলেছে-মুস্তাফিজ যেন আইপিএলে খেলতে না পারেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে ঘৃণামূলক মন্তব্য, ট্রোল আর উসকানিমূলক বক্তব্য। শুধু মুস্তাফিজ নন, এই সিদ্ধান্তের জন্য সরাসরি আক্রমণের মুখে পড়েছেন শাহরুখ খান নিজেও। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির এক নেতা প্রকাশ্যে শাহরুখকে “দেশদ্রোহী” বলে আখ্যা দেন।

একজন ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিক হিসেবে খেলোয়াড় কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া শাহরুখের কাজেরই অংশ। আইপিএল কোনো জাতীয় দলের টুর্নামেন্ট নয়, এটি একটি বেসরকারি লিগ, যেখানে দলগুলো পারফরম্যান্স আর কৌশল বিবেচনায় খেলোয়াড় নেয়। তবুও এই বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে পুরো বিষয়টিকে জাতীয়তাবাদ আর ধর্মীয় পরিচয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করা হচ্ছে। আর সেই কারণেই শাহরুখ খান আবারও হয়ে উঠেছেন সহজ টার্গেট।বিতর্ক যখন চরমে, তখন খবর আসে-ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআই নাকি কলকাতা নাইট রাইডার্সকে মৌখিকভাবে নির্দেশ দিয়েছে পরিস্থিতি বিবেচনায় মুস্তাফিজুর রহমানকে নিয়ে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক চাপের প্রভাব ক্রিকেট প্রশাসনের অন্দরমহলেও পৌঁছেছে।

এই খবর সামনে আসতেই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়-আইপিএল কি এখন আর শুধুই ক্রিকেটের জায়গা? নাকি এখানে বাইরের চাপও সিদ্ধান্ত বদলাতে সক্ষম?এই পুরো ঘটনার কেন্দ্রে থেকেও শাহরুখ খান বরাবরের মতো নীরব। কিন্তু তার নীরবতাই নতুন করে আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। কারণ, অতীতেও শাহরুখকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতা, সংখ্যালঘু অধিকার কিংবা সামাজিক সহাবস্থান নিয়ে তার অবস্থান অনেকের পছন্দ হয়নি। সিনেমা বয়কটের ডাক, ব্যক্তিগত বিশ্বাস নিয়ে কটাক্ষ-এসব নতুন নয়। মুস্তাফিজ ইস্যু যেন সেই পুরোনো বিরোধিতারই নতুন রূপ।
তবে এই বিতর্কের ভেতর থেকেই উঠে এসেছে ভিন্ন কণ্ঠস্বর। ভারতের কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তি ও বিশ্লেষক প্রকাশ্যে বলেছেন-খেলা আর রাজনীতিকে এক করে দেখা বিপজ্জনক। তাদের মতে, এতে কোনো সমস্যার সমাধান হয় না, বরং ক্ষতি হয় দেশের ভাবমূর্তির। আইপিএলের মতো আন্তর্জাতিক লিগে এমন সংকীর্ণ মানসিকতা দেখালে বিশ্বমঞ্চে ভারতের ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একজন খেলোয়াড়কে তার দক্ষতার বদলে পাসপোর্ট বা ধর্ম দিয়ে বিচার করা খেলাধুলার মূল চেতনার পরিপন্থী।এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা থেকে যায়-শেষ পর্যন্ত ক্ষতিটা কার হচ্ছে? মুস্তাফিজ একজন পেশাদার ক্রিকেটার, শাহরুখ খান একজন শিল্পী ও উদ্যোক্তা। কিন্তু খেলাকে যদি রাজনীতির হাতিয়ার বানানো হয়, তাহলে ক্ষতিটা শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। ক্ষতিটা হয় আইপিএলের, হয় বিনোদনের, হয় ভারতের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির।

আজ শাহরুখ খানকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো হচ্ছে-তিনি দেশপ্রেমিক কি না। অথচ বাস্তবতা হলো, একটি ক্রিকেট দল গঠনের সিদ্ধান্ত কখনোই দেশপ্রেম মাপার কাঠি হতে পারে না। এই বিতর্ক হয়তো কিছু সময় পর থেমে যাবে, কিন্তু প্রশ্নটা থেকে যাবে-আমরা কি সত্যিই খেলা আর বিনোদনকে তার নিজস্ব জায়গায় থাকতে দিতে পারছি? নাকি প্রতিবারই রাজনীতির ভারে চাপা দিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেরাই সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা ডেকে আনছি?