শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে বিচার না পেলেও থেমে যাননি ‘আম্মাজান’-খ্যাত শবনম…

মেহেদী হাসান :

দক্ষিণ এশিয়ার চলচ্চিত্র ইতিহাসে শবনম এমন এক নাম, যিনি নিজের প্রতিভা, মাধুর্য ও শক্তিশালী অভিনয়ের মাধ্যমে কোটি দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। ১৯৪৬ সালের ১৭ আগস্ট ঢাকায় জন্ম নেওয়া এই শিল্পী ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানের চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন এবং অল্প সময়েই সেখানে পরিণত হন এক কিংবদন্তীতে। পরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেও তিনি সমানভাবে সাফল্য অর্জন করেন-বিশেষ করে ১৯৯৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘আম্মাজান’ ছবিতে তাঁর অভিনয় এখনো দর্শকের মনে গেঁথে আছে।তবে এই সাফল্যের নেপথ্যে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ ও বেদনাদায়ক অধ্যায়-যা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

আম্মাজান সিনেমার অংশ। ছবি – স্ক্রিনশট

পাকিস্তানে অবস্থানকালে এক রাতে শবনমের বাসায় দুর্বৃত্তরা হামলা চালায়। তাঁকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। পরবর্তীতে জানা যায়, সেই হামলার সঙ্গে যুক্ত ছিল সমাজের প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি। বিষয়টি তৎকালীন পাকিস্তানি সমাজে ব্যাপক আলোড়ন তোলে।ন্যায়বিচারের জন্য লড়াইয়ে শবনমকে অসংখ্য প্রতিকূলতা ও চাপের মুখোমুখি হতে হয়। তাঁর সাহসী অবস্থান তখনকার সময়ের জন্য এক বিরল উদাহরণ ছিল। যদিও অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়, তবুও প্রভাবশালী মহলের চাপে প্রকৃত বিচার নিশ্চিত হয়নি বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ রয়েছে।

অভিনেত্রী শবনম। ছবি – ডেইলি স্টার

শেষ পর্যন্ত শবনম গভীর আঘাত নিয়ে পাকিস্তান ছেড়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন।বাংলাদেশে ফিরে তিনি আবারও অভিনয়ে মনোনিবেশ করেন, যেন জীবনের ভয়াবহতম অধ্যায়টিকে পেছনে ফেলে নতুনভাবে বাঁচতে চান। এখানেই তাঁর অনন্যতা-অসংখ্য নারী যেখানে এমন ঘটনার পর ভেঙে পড়েন, সেখানে শবনম নিজের শক্তি, প্রতিভা ও আত্মবিশ্বাস দিয়ে প্রমাণ করেন, একজন নারী কোনোভাবেই ভুক্তভোগী পরিচয়ে আটকে থাকেন না।

আম্মাজান সিনেমার অংশ। ছবি – স্ক্রিনশট

‘আম্মাজান’-এর মতো ছবিতে তাঁর মায়ের চরিত্র যেন তাঁর বাস্তব জীবনেরই প্রতিচ্ছবি-যে নারী কষ্ট, অপমান, অবিচার সহ্য করেও ভালোবাসা ও মানবতার আলো ছড়িয়ে দেন। শবনমের জীবনের এই দিকটি শুধু একজন অভিনেত্রীর নয়, বরং এক সংগ্রামী নারীর গল্প, যিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে জানতেন, আবার জীবনের মঞ্চে ফিরে আসতেও জানতেন।

অভিনেত্রী শবনম। ছবি – প্রথম আলো

আজও তাঁর জীবনের এই অধ্যায় নারী নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং শিল্পীদের মর্যাদা রক্ষার প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে আলোচনায় আসে। তিনি প্রমাণ করেছেন, জীবনের সব অন্ধকার পেরিয়ে আলোয় ফিরে আসা সম্ভব-যদি ভেতরের সাহসটুকু অটুট থাকে।