মেহেদী হাসান :
বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে খুব কম শিল্পীই আছেন, যাঁরা সময়ের সঙ্গে নিজেকে বারবার ভেঙে নতুন করে গড়তে পেরেছেন। সেই বিরল তালিকার শীর্ষেই নামটি আসে শাকিব খানের। পরিচালক রায়হান রাফির সাম্প্রতিক মন্তব্য আবারও নতুন করে আলোচনায় এনেছে সেই সত্যটাকেই-শাকিব খান শুধু একজন জনপ্রিয় নায়ক নন, তিনি একজন সময়-সচেতন শিল্পী। যিনি জানেন কীভাবে পরিচালকদের সঙ্গে মিশে যেতে হয়, জানেন কীভাবে নিজেকে সমসাময়িক রাখতে হয়, আর জানেন কীভাবে অসম্ভব পরিশ্রম দিয়ে নিজের জায়গাটা ধরে রাখতে হয়।

রায়হান রাফির কথায়, শাকিব খান প্রয়োজনে অভিনয়ের জন্য প্রাণ দিতেও প্রস্তুত। এই কথাটার ভেতরেই লুকিয়ে আছে তাঁর অভিনয়ের প্রতি দায়বদ্ধতা আর পেশাদারিত্বের আসল পরিচয়। একজন তারকা যখন নিজের স্টারডমের আড়ালে লুকিয়ে না থেকে পরিচালকের ভিশনের অংশ হতে চান, তখনই আসলে শিল্পী হিসেবে তাঁর উত্তরণ ঘটে। শাকিব খান ঠিক সেটাই করেছেন বছরের পর বছর ধরে।এই জায়গাটাতেই এসে প্রযোজক শাহরিন সুমির মন্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁর মতে, শাকিব খান নিজেকে সময়ের সঙ্গে ভেঙেছেন, বদলেছেন। আর সেই বদলে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় বড় ভূমিকা রেখেছেন এই প্রজন্মের পরিচালকেরা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-নায়ক হিসেবে শাকিব খান তাঁদের কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনেছেন। এখানে একটা বড় সত্য লুকিয়ে আছে। বাংলাদেশের মতো ইন্ডাস্ট্রিতে, যেখানে সুপারস্টাররা অনেক সময় পরিচালকের ওপরে প্রভাব বিস্তার করেন, সেখানে শাকিব খান উল্টোটা করেছেন। তিনি নিজেকে পরিচালকের হাতে সঁপে দিয়েছেন।চলচ্চিত্রে ২৬ বছর পার করা কোনো নায়কের জন্য এই মানসিকতা ধরে রাখা সহজ নয়। জনপ্রিয়তার চূড়ায় পৌঁছে অনেকেই নিজের নিরাপদ ফর্মুলার বাইরে যেতে চান না।

কিন্তু শাকিব খান সেই পথে হাঁটেননি। তিনি বুঝেছিলেন, সময় বদলাচ্ছে, দর্শকের রুচি বদলাচ্ছে, গল্প বলার ধরন বদলাচ্ছে। আর যদি সেই বদলের সঙ্গে নিজেকে না বদলানো যায়, তাহলে রাজত্ব ক্ষণস্থায়ী হয়ে যায়।এই কারণেই হয়তো একসময় শুধুই ‘মাস এন্টারটেইনার’-এর নায়ক হিসেবে পরিচিত শাকিব খান ধীরে ধীরে নিজেকে প্রমাণ করেছেন ভিন্নধর্মী চরিত্রেও। তাঁর অভিনয়ে এসেছে সংযম, এসেছে গভীরতা, এসেছে চরিত্রের ভেতরে ঢুকে যাওয়ার চেষ্টা। এই পরিবর্তন রাতারাতি হয়নি। এর পেছনে আছে দীর্ঘ প্রস্তুতি, নির্মাতাদের সঙ্গে আলোচনা, নিজের সীমাবদ্ধতাকে মেনে নেওয়ার সাহস।

শাহরিন সুমির বক্তব্যে আরেকটা বিষয় স্পষ্ট-শাকিব খানের একছত্র রাজপাট কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটা পরিকল্পিত, সচেতন এবং কঠোর পরিশ্রমের ফল। একজন নায়ক যদি নতুন প্রজন্মের পরিচালকদের সম্মান করেন, তাঁদের ভাবনাকে গুরুত্ব দেন, তাহলে সেটার প্রভাব পর্দায় পড়বেই। দর্শক সেটাই দেখেছেন, সেটাই গ্রহণ করেছেন।আজকের দিনে দাঁড়িয়ে শাকিব খান শুধু একজন নায়ক নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি তৈরি হয়েছে আত্মতুষ্টি দিয়ে নয়, বরং আত্মভাঙন দিয়ে। নিজেকে ভেঙে ভেঙেই তিনি নতুন করে গড়েছেন নিজের ক্যারিয়ার।
তাই ২৬ বছর পরেও যখন বাংলাদেশের সিনেমায় শাকিব খানের নাম আসে এক নম্বর হিসেবে, তখন সেটা শুধু স্টারডমের গল্প নয়-এটা সময়কে বুঝে নেওয়ার, সময়ের সঙ্গে হাঁটার এবং সময়কে জয় করার গল্প।