রুপালি ডেস্ক: প্রায় চার দশক আগে এফডিসির নতুন মুখের সন্ধানে কার্যক্রমের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে নায়িকা হিসেবে আবির্ভূত হন পারভীন সুলতানা দিতি। একের পর এক সিনেমায় অভিনয় করে নিজেকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যান তিনি। দেশের মানুষের কাছে হয়ে ওঠেন দারুণ জনপ্রিয় এক অভিনেত্রী। শুধু দেশের মানুষের কাছে নয়, দিতি জনপ্রিয় ছিলেন তাঁর সমসাময়িক, আগের ও পরের প্রজন্মের শিল্পীদের কাছেও। কারও সঙ্গে ছিল তাঁর দারুণ পারিবারিক সম্পর্কও।
আজও দিতিকে ভোলেননি তার ভক্তরা। স্যোশাল মিডিয়ায় দিতিকে নিয়ে কোন পোস্ট করলে সেখানে অসংখ্য কমেন্ট আসতে থাকে এবং তার ছবি নিয়ে স্মৃতিচারণাও করেন অনেক ভক্ত।
কিংবদন্তি অভিনেতা রাজ্জাক বেঁচে থাকাকালীন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘দিতি আমাকে বাবা বলে ডাকত। দিতির স্বামী সোহেল চৌধুরী ও আমার ছেলে বাপ্পা একসঙ্গে পড়ালেখা করেছে। সেই হিসেবে দিতি আমাদের পরিবারের সবার খুব আপন। আমাদের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।’

চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরীকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন দিতিকে। তাঁদের সংসারে লামিয়া চৌধুরী ও দীপ্ত নামের দুই সন্তান রয়েছে। বাস্তব জীবনে কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছে দিতিকে। সিনেমায় কাজ করতে গিয়ে সোহেল চৌধুরীর সাথে প্রেম হয় দিতির, প্রেম থেকে পরিণয়।
তবে ধনির দুলাল সোহেল চৌধুরীর সংসারে মন ছিল না। অনেক চেষ্টা করেও সংসার টেকাতে পারেননি দিতি। এর কারণ ছিল সোহেল চৌধুরীর উৎশৃঙ্খল জীবনযাপন, পর নারীতে আসক্তি এবং তার নানা বদ অভ্যাস। বাধ্য হয়ে সোহেলকে ডিভোর্স দেন দিতি। এরপরও নিজের চরিত্রে এতটুকু বদল আনতে পারেননি সোহেল চৌধুরী। চলচ্চিত্র প্রযোজক ও সেই সময়কার প্রভাবশালী ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে বনানির ট্রাম্পস ক্লাবের নিচে সোহেল চৌধুরী খুন হন।
অন্যদিকে, স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চনের মৃত্যুর পর তখন ইলিয়াস কাঞ্চন ছিলেন একা। দিতিও একা ছিলেন। দুজনেই নিজেদের সন্তানদের কথা ভেবে বিয়ে করে সংসার শুরু করেন। কিন্তু তাঁদের সে বিয়ে টেকেনি। ইলিয়াস কাঞ্চনের সঙ্গে জুটি বেঁধে বহু ছবিতে অভিনয় করলেও বাস্তব জীবনের জুটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তবে এ নিয়ে দিতি কিংবা ইলিয়াস কাঞ্চন গণমাধ্যমে খুব বেশি কথা বলেননি।
তবে দিতিকে একজন গুণী শিল্পী মনে করেন ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রথম ছবি ছিল ভাই-বন্ধু। সব মিলিয়ে আমাদের দুজনের অভিনীত ছবির সংখ্যা ৩০-এর মতো। দিতির সঙ্গে আমার শেষ ছবি ছিল আমার নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে বানানো ‘মুন্না মাস্তান’। অভিনয়শিল্পী হিসেবে সে খুব ভালো ছিল। জনপ্রিয়তাও পেয়েছিল। মানুষের ভালোবাসার পাশাপাশি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছে দিতি। সে হিসেবে গুণী শিল্পীও বটে।’
দীর্ঘ রোগভোগের পর ২০১৬ সালের ২০ মার্চ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান দিতি। তাঁর শেষ ইচ্ছানুযায়ী নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে দত্তরপাড়া গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে মা-বাবার কবরের পাশে সমাহিত করা হয় দিতিকে।
১৯৬৫ সালের ৩১ মার্চ নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে দিতির জন্ম। তাঁর অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র উদয়ন চৌধুরী পরিচালিত ‘ডাক দিয়ে যাই’। যদিও ছবিটি মুক্তি পায়নি। দিতি অভিনীত মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম ছবি ছিল আজমল হুদার ‘আমিই ওস্তাদ’।
গ্ল্যামারের সঙ্গে অভিনয় দক্ষতাকে মিশিয়ে সফল হয়েছিলেন দিতি। ৩১ বছরের অভিনয়জীবনে নিজেকে শুধু সিনেমায় ব্যস্ত রাখেননি দিতি, নাটকেও অভিনয় করেছেন এবং পরিচালনাও করেছেন। রান্নাবিষয়ক অনুষ্ঠান উপস্থাপনায়ও দেখা গিয়েছে তাঁকে। অভিনয়ের বাইরে মাঝেমধ্যে গান গাইতেও দেখা গিয়েছে দিতিকে। প্রকাশিত হয়েছে দিতির একক গানের অ্যালবামও। শুধু তাই নয়, বিজ্ঞাপনচিত্রে মডেলও হয়েছেন দিতি।