ফারহান তানভীর :
কলকাতায় এক সন্ধ্যায় যেন ইতিহাস নিজেই হাজির হয়েছিল ক্যামেরার ফ্রেমে। একদিকে বলিউডের ‘বাদশা’ শাহরুখ খান, অন্যদিকে বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা লিওনেল মেসি-দুই মহাতারকার মুখোমুখি হওয়া মুহূর্তটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। করমর্দন, হাসি, সংক্ষিপ্ত কথোপকথন আর একসঙ্গে ছবি-সব মিলিয়ে এই দৃশ্য ভক্তদের কাছে ছিল স্বপ্নের মতো। শাহরুখের সঙ্গে ছিলেন তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র আব্রাম খান। ফুটবল কিংবদন্তিকে সামনে পেয়ে আব্রামের উচ্ছ্বাস লুকোনোর কোনো চেষ্টা ছিল না। মেসিও আলাদাভাবে আব্রামের সঙ্গে ছবি তুলেছেন, যা ইতিমধ্যেই ভাইরাল।‘

গোট ট্যুর অব ইন্ডিয়া ২০২৫’-এর অংশ হিসেবে ভারতে আসা আর্জেন্টাইন তারকা লিওনেল মেসির কলকাতা সফর ঘিরে উত্তেজনার পারদ আগে থেকেই চড়েছিল। শনিবার তিনি কলকাতায় একটি বিশেষ মিট অ্যান্ড গ্রিট অনুষ্ঠানে অংশ নেন। সেখানেই ঘটে এই বহু আলোচিত সাক্ষাৎ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে শাহরুখ খান প্রথমে করমর্দন করেন উরুগুয়ের তারকা লুইস সুয়ারেজ এবং আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার রদ্রিগো দে পলের সঙ্গে। এরপর তিনি এগিয়ে যান মেসির দিকে। দুজনের হাত মেলানো আর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছবি তোলার দৃশ্য দেখে উল্লাসে ফেটে পড়ে উপস্থিত দর্শকরা।

এই অনুষ্ঠানে শুধু শাহরুখ নন, টালিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী শুভশ্রী গাঙ্গুলীকেও দেখা যায় মেসি, সুয়ারেজদের সঙ্গে ছবি তুলতে। ভারতীয় সিনেমা আর বিশ্ব ফুটবলের এই মেলবন্ধন যেন কলকাতাকে পরিণত করেছিল আন্তর্জাতিক এক মঞ্চে। পুরো অনুষ্ঠানে শাহরুখকে দেখা যায় সাদা টি-শার্টের ওপর হলুদ কার্ডিগানে-চিরচেনা স্টাইলিশ অথচ সাবলীল লুকে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ম্যানেজার পূজা দাদলানি ও সন্তানরা। ভিডিওতে দেখা যায়, উল্লাসরত দর্শকের ভিড়ের মধ্য দিয়ে তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছেন ফুটবল তারকাদের দিকে।এই মুহূর্তকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়ার বন্যা বইছে। কেউ লিখেছেন, ‘এটা শুধু ছবি না, এটা ইতিহাস।’ আরেকজন মন্তব্য করেন, ‘দুই মহাতারকা এক ফ্রেমে-এমন দৃশ্য শতাব্দীতে একবার আসে।’

এর আগেও মেসির কলকাতা সফর নিয়ে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন শাহরুখ খান। ১১ ডিসেম্বর নিজের এক্স অ্যাকাউন্টে তিনি লিখেছিলেন, ‘এবার কলকাতায় আমার নাইট (কলকাতা নাইট রাইডার্স)পরিকল্পনা নেই…চাই পুরো দিনটাই হোক মেসিময়। ১৩ তারিখ সল্টলেক স্টেডিয়ামে দেখা হবে।’ ১৩ ডিসেম্বর সকালে বিমানবন্দরে আব্রামের সঙ্গে শাহরুখকে দেখা যাওয়ায় সেই জল্পনা আরও জোরালো হয়।

তবে এই রোমাঞ্চকর আয়োজনের আড়ালে তৈরি হয় বড় ধরনের বিতর্ক ও ক্ষোভ। অনুষ্ঠানের টিকিটের দাম ছিল ১২ হাজার টাকা, যা অনেক দর্শকের কাছেই ছিল ব্যয়বহুল। এত টাকা খরচ করেও বহু দর্শক মাঠে ঢুকে মেসিকে একবার দেখার সুযোগ পাননি বলে অভিযোগ ওঠে। মেসি মাঠে ছিলেন মাত্র ২০ মিনিট। এই স্বল্প উপস্থিতি আর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে মাঠে ক্ষুব্ধ দর্শকদের একাংশ ভাঙচুরে জড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খায় নিরাপত্তা বাহিনী।এই বিশৃঙ্খলার জের ধরে বড় সিদ্ধান্ত নেয় পুলিশ। মেসিকে ভারতে আনার পুরো উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্তকে বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ, আয়োজনের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে ছিল আকাশ-পাতাল পার্থক্য। টিকিট বিক্রি, দর্শক ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা-সব ক্ষেত্রেই গুরুতর গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে কলকাতা সফরের সময় মেসি সল্টলেক স্টেডিয়ামের কাছে নিজের ৭০ ফুট উঁচু মূর্তি ভার্চ্যুয়ালি উন্মোচন করেন। সেই অনুষ্ঠান দেখতে উপচে পড়ে জনসমুদ্র। এই সফরে তাঁর সঙ্গে দেখা করার কথা রয়েছে ভারতের সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলী এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও। কলকাতার পর মেসির যাওয়ার কথা হায়দরাবাদ, মুম্বাই ও দিল্লিসহ আরও কয়েকটি শহরে।সব বিতর্ক, ক্ষোভ আর বিশৃঙ্খলার মাঝেও একটা সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই-শাহরুখ খান ও লিওনেল মেসির সেই করমর্দনের মুহূর্ত ইতিমধ্যেই জায়গা করে নিয়েছে স্মৃতির অ্যালবামে। সময়ের সঙ্গে বিতর্ক মুছে যাবে, কিন্তু দুই বিশ্বতারকার এক ফ্রেমে ধরা পড়া সেই দৃশ্য হয়তো বহুদিন ধরেই ভক্তদের মনে গেঁথে থাকবে।