ফারহান তানভীর :
বলিউডের ইতিহাসে কিছু সম্পর্ক আছে যেগুলো শুধু ব্যক্তিগত অধ্যায় নয়-একটা সময়ের আবহ, তারকাদের মানসিক টানাপোড়েন আর শিল্পের নেপথ্যকথা তুলে ধরে। কিশোর কুমার-যোগীতা বালি-মিঠুন চক্রবর্তীর গল্প সেই তালিকার খুব ওপরে। আলো আর ক্যামেরার ঝলকের আড়ালে তিনজনের জীবনে এমন কিছু সিদ্ধান্ত ঘটে, যেগুলো ভবিষ্যতে বলিউডের পথও বদলে দেয়।

যোগীতা যখন কিশোর কুমারকে বিয়ে করেন, তখন তিনি তরুণ, উচ্ছ্বাসে ভরা, নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তোলার লড়াইয়ে ব্যস্ত এক অভিনেত্রী। অন্যদিকে কিশোর তখন নিজের সেরা সময়ে-‘চলতে চলতে’, ‘রূপ তেরা মস্তানা’, ‘ও সাথী রে’-একটার পর একটা কালজয়ী গান তাকে কিংবদন্তির আসনে বসিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু তার সাফল্যের পেছনে ছিল গভীর এক ব্যক্তিগত অস্থিরতা। হঠাৎ মেজাজ বদলে যাওয়া, অদ্ভুত আবেগপ্রবণতা, কাজের চাপ-সব মিলিয়ে সম্পর্কটি ধীরে ধীরে ফাটল ধরতে শুরু করে।এই সময়টাতেই যোগীতার জীবনে আসেন মিঠুন চক্রবর্তী-একজন উঠতি তারকা, যার ‘মৃগয়া’ অভিনয় তাকে শুরুতেই জাতীয় পুরস্কার এনে দিয়েছিল। ৮০’র দশকজুড়ে ‘ডিস্কো ড্যান্সার’, ‘ওয়ার্ড’, ‘সুরক্ষা’-একটার পর একটা ছবিতে তিনি জনতার হিরো হয়ে ওঠেন। এই জনপ্রিয়তার ভিড়েই যোগীতা নিজের জীবনের নতুন নিরাপত্তা খুঁজে পান। তাদের সম্পর্ক নিয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে নানা কানাঘুষা চলতে থাকে, যা শেষমেশ বাস্তবে রূপ নেয়।

যোগীতা কিশোরকে তালাক দিয়ে মিঠুনকে বিয়ে করেন-সেটা ছিল এক কঠিন সিদ্ধান্ত, আর কিশোর কুমারের জীবনে বড় আঘাত। জীবনের এই ধাক্কা তাকে থামিয়ে দেয়নি, কিন্তু বদলে দিয়েছিল। অনেকে বলেন, এই ঘটনার পর কিশোর আর কখনোই মিঠুনের জন্য গান করেননি। তখনকার চলচ্চিত্র জগতে এটা ছিল একটা নীরব সংকেত-একজন শিল্পীর মানসিক ক্ষত তার পেশাগত সিদ্ধান্তেও ছায়া ফেলছিল।তবু কিশোর নিজের পথে এগিয়ে গেছেন। ব্যক্তিগত দুঃখ সত্ত্বেও ‘আগু’, ‘দিল কেয়া করে’, ‘পেয়ার হমে কিস মোড় পে লে আয়া’-তার পরের দিকের গানগুলোতে একটা হাহাকার, একটা গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেন ভাঙা জীবনের টুকরোগুলোই তার সুরে ঢুকে গিয়েছিল।

মিঠুন-যোগীতা সম্পর্কও ছিল চ্যালেঞ্জের ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা। মিডিয়ার অতিরিক্ত নজর, ক্যারিয়ারের চাপ, জনতার প্রত্যাশা-সবকিছুর মাঝেও তারা চার দশকের বেশি সময় ধরে সংসার টিকিয়ে রেখেছেন। বলিউডে যেখানে সম্পর্ক ভাঙা-মোছার গল্প খুব সাধারণ, সেখানে এই জুটি এখন নিজেই একটি ইতিহাস।কিন্তু এই ত্রিভুজের কেন্দ্রে যে মানুষটা থেকে যান, তিনি কিশোর কুমার।ব্যক্তিগত জীবনের জটিলতা তাকে কখনো থামাতে পারেনি-তার কণ্ঠ এখনও কোটি মানুষের ভালোবাসার প্রতীক। আর মিঠুন? তিনি এখনও ভারতীয় সিনেমার সবচেয়ে আইকনিক ব্যক্তিত্ব-সংগ্রাম, নাচ, অ্যাকশন আর চরিত্রের বৈচিত্র্য মিলিয়ে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প।

এটা কারও পক্ষে দাঁড়ানোর গল্প নয়।এটা ভালোবাসা, ভুল সিদ্ধান্ত, ক্ষত, সুস্থ হওয়া আর তারকাদের সূক্ষ্ম মানবিকতার ইতিহাস।যে মানুষটা এক যুগকে গান শিখিয়েছে, যে মানুষটা একটা প্রজন্মকে নাচতে শিখিয়েছে আর যে নারী দুজন সুপারস্টারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের পথ বেছে নিয়েছিলেন-তাদের তিনজনের জীবনের এই অধ্যায় বলিউডকে আজও আলোচনামুখর করে রাখে।