বাবা বলেছিলেন,সিনেমাটা খেলার জিনিস নয়। এটা কমিটমেন্ট-কোয়েল মল্লিক

মেহেদী হাসান :

প্রথম ছবির প্রস্তুতি চলার সময়, বাবার মুখে শোনা সেই এক লাইনের উপদেশ-“সিনেমা খেলার জিনিস নয়, এটা কমিটমেন্ট”-আজও কোয়েল মল্লিকের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে শক্ত ভিত। রঞ্জিত মল্লিক টলিউডে যে জায়গা তৈরি করেছেন, সেটা শুধু একজন কিংবদন্তির জনপ্রিয়তা নয়; তার চেয়েও বড় হলো তার কর্মনৈতিকতা। তিনি ছিলেন সেই প্রজন্মের শিল্পী, যাদের কাছে সিনেমা ছিল দায়িত্ব, পেশাদারি ছিল নীতির অংশ, আর দর্শকদের প্রতি সততা ছিল বাধ্যতামূলক। সেটে সময়মতো আসা, সহশিল্পীদের সম্মান করা, চরিত্রের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যাকগ্রাউন্ড রিসার্চ করা-এগুলো ছিল রঞ্জিত মল্লিকের স্বাভাবিক নিয়ম, যেগুলো পুরো ইন্ডাস্ট্রির কাছে তাঁকে এক আলাদা জায়গায় বসিয়েছে।

একই ফ্রেমে মেয়ে কোয়েল মল্লিক ও বাবা রঞ্জিত মল্লিক-ইন্ডিয়া টুডে

ঠিক এই কঠিন মানদণ্ডই কোয়েলের শুরুটা সহজ করেনি। তিনি নিজেই স্বীকার করেন-বাবার নাম তাঁর জন্য যেমন দরজা খুলেছে, তেমনি তার থেকেও বড় ছিল “বাবার মতো হতে পারব তো?” এই চাপ। কারণ তুলনা তো হতেই থাকবে।একজন প্রতিষ্ঠিত অভিনেতার মেয়ে, আর তার অভিনয় দক্ষতা কতটা ধরে রাখতে পারে সেই উত্তরাধিকার। কিন্তু এখানেই কোয়েলের জার্নিটা আলাদা-তিনি কখনো বাবার ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকতে চাননি, বরং নিয়মিত পরিশ্রম আর আত্মনিবেদনের মাধ্যমে নিজের পরিচয় আলাদা করে তোলার চেষ্টা করেছেন।

অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক – ইন্সটাগ্রাম থেকে

‘চ্যালেঞ্জ’, ‘পাগলু’, ‘প্রীতিম’, ‘হেমলক সোসাইটি’, ‘রংবাজ’, ‘বাজিমাত’, ‘রক্তরহস্য’-প্রতিটি ছবিই কোয়েলের ক্ষমতার ভিন্ন ভিন্ন দিক তুলে ধরেছে। ক্যারিয়ারের শুরুতে বাণিজ্যিক রোমান্সে ঝড় তোলা থেকে শুরু করে পরবর্তীতে চরিত্রনির্ভর ছবিতে নিজের অভিনয়কে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়া-কোয়েল ধীরে ধীরে দেখিয়েছেন তিনি শুধুই স্টারকিড নন; তিনি ইন্ডাস্ট্রির নিজের যোগ্যতায় জায়গা করে নেওয়া একজন নায়িকা। আর এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন দুই দশক ধরে-যে সময়সীমা নিজেই প্রমাণ করে দেয় তিনি শুধু জনপ্রিয় ছিলেন না, তিনি টিকে থেকেছেন।

ইন্টারভিউয়ের ফাঁকে কোয়েল ও রঞ্জিত মল্লিক – আইএমডিবি

রঞ্জিত মল্লিকের ক্ষেত্র যেখানে ছিল স্থিরতা ও সংযমের অভিনয়, কোয়েল সেখানে তৈরি করেছেন নিজের স্বতন্ত্র এক ভার্সন-উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত, এবং খুবই শৃঙ্খলাপূর্ণ। বাবার দেওয়া উপদেশ তাঁকে শুধু শিল্পী হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবেও পরিপক্ব করেছে। তিনি বারবার বলেছেন, দর্শকের বিশ্বাস অর্জন করা সবচেয়ে কঠিন কাজ-আর সেই বিশ্বাস ধরে রাখা আরও কঠিন। তাই তিনি প্রতিটি চরিত্রে সততার সঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করেছেন, কারণ তাঁর মতে, “দর্শকের ঘামের টাকায় টিকিট কেনা মানে তারা আমাকে বিশ্বাস করছে।”

কোয়েল মল্লিকের ইন্সটাগ্রাম থেকে

এই জায়গাটাই মূলত আজ কোয়েল মল্লিককে দর্শকদের মনে বিশেষ অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। তাঁকে শুধু “রঞ্জিত মল্লিকের মেয়ে” বলা হয় না আর; বরং বলা হয়-তিনি সেই প্রজন্মের টলিউড নায়িকা যাঁর ছবির পাশে পরিবার নিশ্চিন্তে বসতে পারে, যাঁর উপস্থিতি মানে বড় ব্যানারের আস্থা, আর যাঁর কাজ মানে পরিচ্ছন্নতা ও পেশাদারিত্ব। কোয়েলের জনপ্রিয়তা এসেছে তড়িঘড়ি সফলতা থেকে নয়; এসেছে দীর্ঘ সময় ধরে দর্শকের কাছে ধারাবাহিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠার মাধ্যমে।