ফারহান তানভীর :
ঢালিউড সিনেমার ইতিহাসে এমন কিছু শিল্পী আছেন, যাঁদের নাম শুধু একজন অভিনেতার পরিচয় নয়-একটি অনুভূতি, একটি উপাধি হয়ে গেছে। অভিনেতা দিলদার ঠিক তেমনই একজন। একসময় তাঁর উপস্থিতিই ছিল দর্শকের হাসির নিশ্চয়তা। আজও কাউকে অতিরিক্ত হাস্যরসাত্মক দেখলে মানুষ মজা করে বলে ওঠে-‘একেবারে দিলদার হয়ে গেছিস।’ এই একটি বাক্যই প্রমাণ করে, তিনি কেবল পর্দায় অভিনয় করেননি, মানুষের দৈনন্দিন ভাষা ও সংস্কৃতিতে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন।

সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ২০ বছর বয়সে অভিনয়জীবন শুরু করেন দিলদার। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের স্বতন্ত্র কৌতুকধর্মী অভিনয়শৈলী দিয়ে আলাদা করে চেনাতে থাকেন নিজেকে। মুখভঙ্গি, সংলাপ বলার ভঙ্গি, শরীরী ভাষা-সবকিছু মিলিয়ে তিনি ছিলেন একেবারেই নিজস্ব ঘরানার একজন অভিনেতা। বাংলা সিনেমায় কৌতুক অভিনেতা হিসেবে তাঁর দক্ষতা এতটাই অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল যে, দীর্ঘ তিন দশকের ক্যারিয়ারে তিনি হয়ে ওঠেন প্রায় অপরিহার্য এক চরিত্র।১৯৪৫ সালের ১৩ জানুয়ারি চাঁদপুরে জন্মগ্রহণ করেন এই গুণী অভিনেতা। পারিবারিক জীবনে তিনি ছিলেন দুই কন্যা সন্তানের জনক। স্ত্রী ও দুই কন্যা আজও বেঁচে আছেন, কিন্তু পরিবারের ভাষায়, দিলদারের মৃত্যুর পর জীবন যেন আর আগের মতো থাকেনি। ৫৮ বছর বয়সে তাঁর আকস্মিক প্রয়াণ শুধু চলচ্চিত্র অঙ্গনকেই নয়, ভেঙে দিয়েছিল তাঁর পরিবারকেও।

এক সাক্ষাৎকারে দিলদারের মেয়ে দুঃখ ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, মৃত্যুর প্রথম দুই বছর মানুষ বাবাকে স্মরণ করত, কিন্তু এরপর ধীরে ধীরে সবই ফিকে হয়ে গেছে। এখন তাঁরা নিজেরাই পারিবারিকভাবে স্মরণ করেন দিলদারকে। চলচ্চিত্র অঙ্গনের যাঁদের বাবাকে স্মরণ করার কথা ছিল, তাঁরাই যেন দিনটি ভুলে থাকেন। প্রিয় মানুষদের কাছ থেকে এত দ্রুত হারিয়ে যাবেন-এমনটা তিনি বা তাঁর পরিবার কেউই ভাবেননি।দিলদারের মৃত্যুর পর পরিবারের পাশে যে আস্থার দেয়াল থাকার কথা ছিল, সেটিও ভেঙে পড়ে। চেনা মানুষগুলো হয়ে ওঠে অচেনা। জন্মদিন বা মৃত্যুবার্ষিকীতে খুব একটা কেউ খোঁজ নেন না। এমনকি পরিবারের সংকটময় সময়েও পাশে পাওয়া যায়নি সেই মানুষগুলোকে, যাঁদের সঙ্গে দিলদার জীবনের বড় সময়টা কাটিয়েছেন।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয়টি সামনে আসে তাঁর পারিশ্রমিক সংক্রান্ত ঘটনায়। জানা যায়, মৃত্যুর সময় বিভিন্ন প্রযোজকের কাছে দিলদারের পাওনা ছিল প্রায় ৮০ লাখ টাকা। পরিবারের দুঃসময়ে এই অর্থ তারা কখনোই হাতে পাননি। তাঁর বড় মেয়ে জানান, দিলদার কখনো কারও কাছে এক-দুবারের বেশি টাকা চাইতেন না। এই স্বভাবের কারণেই অনেক সময় পরিচিত ও কাছের প্রযোজকদের কাছ থেকে অগ্রিম পারিশ্রমিক নিতেন না। এভাবেই জমতে থাকে বিপুল অঙ্কের পাওনা টাকা।তিনি আরও জানান, বাবার মৃত্যুর সময় প্রযোজকদের কাছ থেকে পাওয়া ৩৫ লাখ টাকার কয়েকটি চেক বাসায় ছিল, কিন্তু সেই অর্থও তাঁরা তখন আদায় করতে পারেননি। এমনকি সুপারহিট ছবি ‘আবদুল্লাহ’র ক্ষেত্রেও ছিল এক ব্যতিক্রমী চুক্তি। ছবিটি ব্যবসায়িকভাবে সফল হলে দিলদার পাবেন ১০ লাখ টাকা, আর ব্যর্থ হলে কিছুই নয়। নায়ক হিসেবে তাঁকে নিয়ে ঝুঁকি নেওয়া হচ্ছে-এই যুক্তিতে প্রযোজকের প্রস্তাবে দিলদার রাজি হয়েছিলেন। এই ঘটনাই তাঁর পেশাদার সততা ও আত্মবিশ্বাসের বড় প্রমাণ।

১৯৭২ সালে ‘কেন এমন হয়’ চলচ্চিত্র দিয়ে তাঁর অভিনয়জীবনের সূচনা। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ‘বেদের মেয়ে জোসনা’, ‘বিক্ষোভ’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘কন্যাদান’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’, ‘সুন্দর আলীর জীবন সংসার’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘শান্ত কেন মাস্তান’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে তিনি দর্শককে হাসিয়েছেন, কাঁদিয়েছেন, আবার কখনো সমাজের বাস্তবতাও তুলে ধরেছেন।দিলদার ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যিনি পর্দায় মানুষকে হাসাতে হাসাতে নিজের জীবনের অনেক কষ্ট চেপে রেখেছিলেন। আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর হাসি, তাঁর অভিনয়, আর তাঁর সঙ্গে হওয়া অবিচারের গল্প-সব মিলিয়ে দিলদার শুধু একজন কৌতুক অভিনেতা নন, তিনি ঢালিউডের এক নীরব ট্র্যাজেডির নাম।