ফারহান তানভীর :
পরিচালক রাকিবুল আলম রকিব যখন নায়ক মান্নাকে নিয়ে কথা বলেছিলেন,তখন সেটা নিছক কোনো সাক্ষাৎকারের উত্তর ছিল না-তা হয়ে উঠেছিল একজন শিল্পীর কাজের প্রতি সততা আর দায়বদ্ধতার জীবন্ত দলিল। এমনই এক অভিজ্ঞতার কথা তিনি বলেছিলেন ‘রিকশাওয়ালার প্রেম’ সিনেমার শুটিং প্রসঙ্গে, যা আজও শুনলে অবাক হতে হয়।

সেই দৃশ্যে পরিকল্পনা ছিল একেবারেই সাধারণ। মান্নাকে বলা হয়েছিল, তাঁর নায়িকা নিপুণ বালির মধ্যে একটি আংটি ফেলবেন, আর তিনি সেটি খুঁজে বের করবেন। শুটিংয়ের ভাবনাও সেখানেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু পরিচালক হিসেবে রকিবের মনে হলো, যদি আগের দৃশ্যে মান্নার শারীরিক দুর্বলতা বা অসুস্থতা দেখানো যায়, আর পরের দৃশ্যে তিনি পানির ভেতর নেমে নিপুণের ফেলা আংটি তুলে আনেন-তাহলে দৃশ্যটি শুধু গল্পের অংশ নয়, দর্শকের হৃদয়ের অংশ হয়ে উঠবে। আবেগ আরও গভীর হবে, চরিত্র আরও বিশ্বাসযোগ্য লাগবে।

অথচ যেদিন এই দৃশ্যের শুটিং হওয়ার কথা, সেদিন বাস্তবেই মান্না ভীষণ জ্বরে ভুগছিলেন। সেটে তিনি এসেছিলেন চাদর জড়ানো অবস্থায়। কিন্তু পরিচালক কিংবা ইউনিটের কেউই জানতেন না তাঁর শরীরের এই অবস্থার কথা। পরিচালক যখন পরিকল্পনা বদলে বললেন, বালির বদলে পানির ভেতর নামতে হবে, মান্না এক মুহূর্তও না ভেবে তাতেই রাজি হয়ে যান। নিজের শারীরিক কষ্টের কথা একবারও মুখে আনেননি, যেন সেটে তিনি শুধু একজন অভিনেতা নন-পুরো সিনেমাটার দায়িত্ব তাঁর কাঁধে।শ্যুটিং শেষ হওয়ার পর মান্না হালকা হাসি দিয়ে বলেছিলেন, “আমার কিন্তু আসলেই জ্বর ছিল।” তখন পরিচালক তাঁকে জড়িয়ে ধরে বুঝতে পারেন-শরীর সত্যিই জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।

সঙ্গে সঙ্গে শুটিং প্যাকআপ করার সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে মান্না তাতে রাজি হননি। তিনি বলেন, একদিন কক্সবাজারে থাকা আর শুটিং করতে তোমার প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হয়। এখন প্যাকআপ করলে সেই পুরো টাকাটাই লস হবে। দরকার নেই, শুটিং চলুক।এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল একজন প্রকৃত তারকার মানসিকতা-যিনি শুধু নিজের শরীরের কথা ভাবেন না, ভাবেন পুরো ইউনিট, প্রযোজক আর সিনেমাটার ভবিষ্যৎ নিয়ে। এই কারণেই মান্না শুধু শুটিং সেটে নয়, সেটের বাইরেও আলাদা হয়ে থাকতেন।এই দায়িত্ববোধ তাঁর ক্যারিয়ার জুড়েই ছিল।

সিনেমা মুক্তির পরেও তিনি নিয়মিত খোঁজ রাখতেন ছবির খবর। দেশের শেষ প্রান্তের কোনো হলে সিনেমা চলছে কি না, কত টাকার টিকিট বিক্রি হচ্ছে, দর্শকের সাড়া কেমন-সবকিছুই জানার চেষ্টা করতেন তিনি। নিজের সিনেমাকে তিনি কখনোই কেবল ব্যবসা বা জনপ্রিয়তার হিসাব হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন নিজের সম্মানের জায়গা হিসেবে।আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এমন ডেডিকেশন, এমন দায়িত্ববোধ বর্তমান নায়কদের মধ্যে প্রায় দেখাই যায় না। তাই মান্না শুধু জনপ্রিয় নায়ক ছিলেন না-তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন মহানায়ক, যাঁর পরিচয় শুধু পর্দায় নয়, মানুষ হিসেবেও অটুট।