নায়ক জসিমের সম্পর্কে এই তথ্যগুলো কি জানা ছিল আপনাদের?

ফারহান তানভীর :

বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে যাঁদের নাম উচ্চারিত হলেই আলাদা একটা দাপট, একটা শক্ত উপস্থিতি চোখের সামনে ভেসে ওঠে-নায়ক জসিম তাঁদের মধ্যে অন্যতম। পর্দায় শুধু ‘জসিম’ নামেই তিনি পরিচিত ছিলেন, কিন্তু তাঁর আসল নাম ছিল আবুল খায়ের জসিম উদ্দিন। এই তথ্যটা আজও অনেক দর্শকের অজানা। অথচ এই মানুষটাই ছিলেন আধুনিক বাংলা চলচ্চিত্রের অ্যাকশন ধারার পথিকৃৎ, যিনি নিজের শরীরী ভাষা, মারদাঙ্গা উপস্থিতি আর সাহসী অভিনয়ের মাধ্যমে এক নতুন ধারা তৈরি করেছিলেন।

নায়ক জসিম – আইএমডিবি

চলচ্চিত্রে জসিমের যাত্রা শুরু হয়েছিল নায়ক হিসেবে নয়, বরং খলনায়ক চরিত্র দিয়ে। ১৯৭২ সালে প্রয়াত পরিচালক জহিরুল হকের হাত ধরে তিনি চলচ্চিত্রাঙ্গনে পা রাখেন। ১৯৭৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘রংবাজ’ ছবিতে খলনায়ক হিসেবে অভিনয় করে দর্শকের নজর কাড়েন তিনি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ‘রংবাজ’ ছিল বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র যেখানে পরিকল্পিত অ্যাকশন দৃশ্য যুক্ত করা হয়। এখান থেকেই জসিমের সঙ্গে অ্যাকশন সিনেমার এক অদ্ভুত কিন্তু শক্ত বন্ধন তৈরি হয়। পরবর্তীতে একই পরিচালকের ‘সবুজ সাথী’ চলচ্চিত্রে তিনি প্রথমবার প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন এবং ধীরে ধীরে নায়ক হিসেবে নিজের জায়গা পাকা করে নেন।

জসিম শুধু পর্দার নায়ক ছিলেন না, বাস্তব জীবনেও তিনি ছিলেন একজন বীর। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। দুই নম্বর সেক্টরে মেজর হায়দারের নেতৃত্বে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে লড়াই করেছিলেন জসিম। এই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাঁর অভিনয়েও প্রভাব ফেলেছিল বলে মনে করেন অনেকেই-কারণ তাঁর চোখে-মুখে যে আগুন, যে দৃঢ়তা দেখা যেত, তা কৃত্রিম মনে হতো না।

নায়ক জসিম ও নায়িকা শাবানা – আইএমডিবি

১৯৭৭ সালে দেওয়ান নজরুল পরিচালিত ‘দোস্ত দুশমন’ ছবির মাধ্যমে জসিম বাংলা চলচ্চিত্রে তুমুল আলোড়ন তোলেন। ছবিটি ছিল হিন্দি চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় ছবি ‘শোলে’-এর রিমেক। সেখানে জসিম অভিনয় করেছিলেন গব্বার চরিত্রে। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো-‘শোলে’ ছবিতে গব্বার সিং চরিত্রে অভিনয় করা কিংবদন্তি খলনায়ক আমজাদ খান নিজেই জসিমের অভিনয়ের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। একজন ভারতীয় আইকন যখন বাংলাদেশের একজন অভিনেতার কাজের প্রশংসা করেন, তখন সেটা নিছক অভিনয় নয়-তা হয়ে ওঠে স্বীকৃতির দলিল।

স্বাধীনতার পর বাংলা চলচ্চিত্রকে আধুনিক অ্যাকশন ধারায় এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে জসিমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের সিনেমায় ‘ফাইটিং গ্রুপ’ ধারণা, স্টান্ট নির্ভর নায়কি ভাব-সবকিছুর শুরুটা হয়েছিল তাঁর হাত ধরেই। তিনি এমন এক সময় নায়ক ছিলেন, যখন নায়ক মানে শুধু রোমান্টিক নাচ-গান নয়, বরং শক্তি, প্রতিবাদ আর সংগ্রামের প্রতীক।নায়িকা শাবানার সঙ্গে জসিমের সম্পর্কও বাংলা চলচ্চিত্রে এক বিরল উদাহরণ। তিনিই একমাত্র নায়ক, যিনি একই অভিনেত্রীর সঙ্গে প্রেমিক এবং ভাই-দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন। ‘সারেন্ডার’ ছবিতে শাবানার প্রেমিক হিসেবে তিনি যেমন সফল ছিলেন, ঠিক তেমনি ‘অবদান’ ও ‘মাস্তান রাজা’ ছবিতে বড় ভাইয়ের চরিত্রেও দর্শকের মন জয় করেছিলেন।

শ্যুটিংয়ে নায়ক জসিম – ঢাকা ট্রিবিউন

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস হলো-আজকের জনপ্রিয় নায়ক রিয়াজকে প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন জসিম। ১৯৯৪ সালে রিয়াজ চাচাতো বোন ববিতার সঙ্গে বিএফডিসিতে ঘুরতে এসে জসিমের নজরে পড়েন। জসিম নিজেই তাঁর মধ্যে নায়ক হওয়ার সম্ভাবনা দেখেন এবং অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৫ সালে ‘বাংলার নায়ক’ ছবিতে জসিমের সঙ্গে প্রথম অভিনয় করেন রিয়াজ। বলা যায়, বাংলা সিনেমার এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে সেতুবন্ধন তৈরি করেছিলেন জসিম।

ব্যক্তিগত জীবনেও জসিম ছিলেন আলোচিত। তাঁর প্রথম স্ত্রী ছিলেন ড্রিমগার্লখ্যাত চিত্রনায়িকা সুচরিতা। পরবর্তীতে তিনি বিয়ে করেন ঢাকার প্রথম সবাক চলচ্চিত্রের নায়িকা পূর্ণিমা সেনগুপ্তার কন্যা নাসরিনকে। ১৯৯৮ সালের ৮ অক্টোবর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে এই শক্তিমান অভিনেতা ইহলোক ত্যাগ করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি নায়ক হিসেবেই অভিনয় চালিয়ে গিয়েছিলেন, যা তাঁর আত্মবিশ্বাস আর জনপ্রিয়তারই প্রমাণ।

নায়ক জসিম – আইএমডিবি

জসিমের প্রয়াণের পর তাঁর প্রতি সম্মান জানিয়ে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে (বিএফডিসি) তাঁর নামে একটি ফ্লোরের নামকরণ করা হয়-যা বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসে খুব কম শিল্পীর ভাগ্যে জুটেছে। ‘রংবাজ’, ‘প্রতিনিধি’, ‘এক মুঠো ভাত’, ‘আসামি হাজির’, ‘মহেশখালীর বাঁকে’, ‘প্রতিজ্ঞা’, ‘ঘরের বউ’, ‘জনি’, ‘অভিযান’, ‘অশান্তি’, ‘নিষ্পাপ’, ‘লালু মাস্তান’, ‘সারেন্ডার’, ‘মাস্তান’, ‘কাজের বেটি রহিমা’, ‘কালিয়া’, ‘স্বামী কেন আসামি’-এমন অসংখ্য সিনেমার মাধ্যমে জসিম আজও বেঁচে আছেন দর্শকের স্মৃতিতে।জসিম কেবল একজন অভিনেতা নন, তিনি ছিলেন একটি সময়, একটি ধারা এবং একটি শক্ত প্রতীক-যার প্রভাব আজও বাংলা চলচ্চিত্রের শরীরে রয়ে গেছে।