নায়করাজ রাজ্জাকের ৮৪ তম জন্মদিন আজ! কতটা জানেন তাঁর সম্পর্কে?

ফারহান তানভীর :

১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি, কলকাতার ৮ নম্বর নাকতলা রোডের একটি বাড়িতে জন্ম নিল এক শিশু-যিনি সময়ের পরিক্রমায় হয়ে ওঠেন বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীকগুলোর একজন, নায়করাজ আব্দুর রাজ্জাক। জন্মের পর এই পথ যে এতটা কঠিন, সংগ্রামের আর অশ্রুর হবে-তা হয়তো তখন কেউ কল্পনাও করেনি। কিন্তু রাজ্জাকের জীবনটাই ছিল সংগ্রামকে জয় করার এক দীর্ঘ, নিরবচ্ছিন্ন অধ্যায়।

চিত্রনায়ক আব্দুর রাজ্জাক – আইএমডিবি

কলেজে পড়ার সময় থেকেই অভিনয়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। তবে শুরুটা মোটেও নায়কোচিত ছিল না। ১৯৫৮ সালে অজিত ব্যানার্জির ‘রতন লাল বাঙালি’ ছবিতে তিনি ছিলেন একেবারেই নগণ্য চরিত্রে-একজন পকেটমার। পরের ছবি ‘পঙ্ক তিলক’ ও ‘শিলালিপি’-তেও একই অবস্থা। এক্সট্রা শিল্পী হিসেবে কাজ, কখনো সম্মানী নেই, কখনো মাত্র ২০ টাকা। তবু এই সামান্য পারিশ্রমিকই তাঁর মনে বিশ্বাস জাগিয়েছিল-চেষ্টা চালিয়ে গেলে কিছু একটা হবে। কিন্তু টালিগঞ্জে নিজের ভবিষ্যৎ সীমাবদ্ধ বুঝে তিনি পাড়ি জমান বোম্বেতে। সেখানে ‘ফিল্মালয়’ নামের অভিনয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন। দিলীপ কুমারের মতো কিংবদন্তিদের ক্লাস দেখেছেন কাছ থেকে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁর ধৈর্যের সঙ্গে মানানসই ছিল না। সুযোগ না পেয়ে আবার ফিরে আসেন কলকাতায়।

চিত্রনায়ক আব্দুর রাজ্জাক – ঢাকা ট্রিবিউন

এরপর জীবনের মোড় ঘুরে যায় উপমহাদেশজুড়ে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সময়। ১৯৬৪ সালের ২৬ এপ্রিল স্ত্রী লক্ষ্মী ও শিশুপুত্র বাপ্পাকে নিয়ে শরণার্থী হয়ে ঢাকায় আসেন রাজ্জাক। শুরু হয় নতুন লড়াই। প্রথমে কমলাপুর ঠাকুরপাড়া, পরে নয়াটোলা-অস্থির জীবনে একের পর এক ঠিকানা বদল। জীবিকা নির্বাহের জন্য টেলিভিশন নাটকে অভিনয় শুরু করেন। সপ্তাহে আয় ৬০-৬৫ টাকা, অথচ মাসের খরচ ৬০০ টাকা। সন্তানদের দুধ জোগাড় করতেই সব টাকা শেষ হয়ে যেত। অনেক দিন স্বামী-স্ত্রী দুজন না খেয়েও থেকেছেন। ফার্মগেট থেকে ডিআইটি টিভি কেন্দ্রে হেঁটে যাতায়াত করতেন, কারণ বাসভাড়ার টাকাও ছিল না।ঢাকায় প্রথম চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন ১৯৬৫ সালে ‘আখেরি স্টেশন’-এ, সহকারী স্টেশনমাস্টারের চরিত্রে। এরপর একে একে ছোট চরিত্র-‘কার বউ’-এ বেবিট্যাক্সি ড্রাইভার, ‘ডাকবাবু’-তে আদালতের কর্মচারী, ‘কাগজের নৌকা’-য় মাতাল। পাশাপাশি সহকারী পরিচালক হিসেবেও কাজ করেন কামাল আহমেদের ‘উজালা’ ও ‘পরওয়ানা’ ছবিতে।

চিত্রনায়ক আব্দুর রাজ্জাক – জলসা ঘর

তবু অভাব ঘোচে না। আশার আলো আসে জহির রায়হানের হাত ধরে। ‘বেহুলা’ ছবিতে নায়ক হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হন রাজ্জাক। সাইনিং মানি ৫০০ টাকা। সেই টাকা পেয়ে খুশিতে মিষ্টি খাইয়েছিলেন বন্ধুদের। ‘বেহুলা’ শুধু বক্স অফিসে সফল হয়নি, পূর্ব পাকিস্তানের দর্শক রাজ্জাককে আপন করে নেয়। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি।এক্সট্রা থেকে নায়ক হয়ে ওঠার এই গল্প রাজ্জাকই সম্ভব করে দেখিয়েছিলেন। ‘অবুঝ মন’, ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘ময়নামতি’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘স্মৃতিটুকু থাক’, ‘রংবাজ’, ‘অশিক্ষিত’, ‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘লাইলি মজনু’-একটির পর একটি ছবি তাঁকে শীর্ষে পৌঁছে দেয়। বিশেষ করে রাজ্জাক-কবরী জুটি ঢাকার চলচ্চিত্রে এক অনন্য অধ্যায়। আবার শাবানা, ববিতা, সুচন্দা, রোজিনা, সুচরিতা-প্রায় সব নায়িকার সঙ্গেই তাঁর জুটি দর্শকপ্রিয় হয়েছে।

চিত্রনায়ক আব্দুর রাজ্জাক – মাইটিভি

ব্যক্তিজীবনে লক্ষ্মীর অবদান ছিল নীরব কিন্তু অটুট। স্বামীর জনপ্রিয়তা নিয়ে নানা গুঞ্জন, ভক্তদের ভিড়-সবকিছু নীরবে সামলেছেন তিনি। কখনো বাধা দেননি, বরং সাহস জুগিয়েছেন। সেই ত্যাগের ফলেই ফার্মগেটের ছোট বাসা থেকে একদিন গুলশানে ‘লক্ষ্মীকুঞ্জ’ গড়ে ওঠে।২০১৬ সালে এফডিসিতে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে রাজ্জাক নিজেই বলেছিলেন-আজকের নায়করাজ একার কৃতিত্ব নয়। পরিচালকরা যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, তিনি ছিলেন সেই যুদ্ধে একজন সৈনিক। মেকআপ রুমের ফ্লোরে ঘুমিয়ে দিনের পর দিন কাজ করেছেন। কথা বলতে বলতে কেঁদেছিলেন তিনি, আর তাঁর সঙ্গে কেঁদেছিল উপস্থিত মানুষও।

চিত্রনায়ক আব্দুর রাজ্জাক – হ্যাভেন নিউজ

২০১৭ সালের ২১ আগস্ট নায়করাজ রাজ্জাক চলে যান চিরতরে। কিন্তু তাঁর গল্প, সংগ্রাম আর বিশ্বাস রয়ে গেছে। শরণার্থী হয়ে আসা এক তরুণ কীভাবে এক্সট্রা থেকে ঢাকাই চলচ্চিত্রের রাজা হয়ে ওঠেন-রাজ্জাক তার জীবন্ত প্রমাণ। আজ তাঁর ৮৪ তম জন্মদিনে আমরা শুধু একজন অভিনেতাকে নয়, এক অদম্য স্বপ্নবাজ মানুষকে স্মরণ করি।