ফারহান তানভীর:
ভারতীয় সংগীত জগতের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম শ্রেয়া ঘোষাল । দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁর কণ্ঠে মুগ্ধ হয়েছে উপমহাদেশের কোটি কোটি শ্রোতা। অসংখ্য সুপারহিট গান, জাতীয় পুরস্কার ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি-সব মিলিয়ে তিনি আজ ভারতীয় প্লেব্যাক সংগীতের সবচেয়ে জনপ্রিয় কণ্ঠগুলোর একটি। তবে জনপ্রিয়তার এই উচ্চতায় পৌঁছেও নিজের নীতি ও মূল্যবোধের প্রশ্নে আপস করেননি এই শিল্পী। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, বলিউডের বহুল আলোচিত আইটেম গান ‘ফেভিকল সে’ গাওয়ার প্রস্তাব তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন কেবল নিজের বিবেকের তাগিদেই।

শ্রেয়া ঘোষাল জানান, তাঁকে ‘ফেভিকল সে’ গানটি গাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু গানের লাইনগুলো পড়ে তাঁর নিজের কাছেই অস্বস্তি হচ্ছিল। একজন নারী হয়ে অন্য নারীদের নিয়ে এমন শব্দ ব্যবহার করা তাঁর কাছে অসম্মানজনক মনে হয়েছে। সেই কারণেই তিনি সুরকার ও গীতিকারের কাছে ক্ষমা চেয়ে স্টুডিও থেকে বেরিয়ে আসেন। তাঁর মতে, একজন নারী শিল্পী হিসেবে এমন গান গাওয়া তাঁর পক্ষে শোভন নয়।এই আলোচিত গানটি বলিউডের জনপ্রিয় ছবি দাবাং ২ -এর একটি আইটেম সং।

ছবিটিতে অভিনয় করেছেন বলিউড সুপারস্টার সালমান খান , সোনাক্সী সিনহা এবং প্রকাশ রাজ সহ অনেকেই। তবে ‘ফেভিকল সে’ গানটির বিশেষ আকর্ষণ ছিলেন অভিনেত্রী কারিনা কাপুর । এই আইটেম গানে তাঁর ঝলমলে উপস্থিতি সেই সময় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। গানটি শেষ পর্যন্ত গেয়েছিলেন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী মমতা শর্মা । মুক্তির পরপরই গানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশন এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ইউটিউবসহ নানা প্ল্যাটফর্মে কোটি কোটি মানুষ গানটি শুনেছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে এটি বলিউডের সবচেয়ে আলোচিত আইটেম গানের তালিকায় ছিল।বর্তমান সময়েও এই গানের চাহিদা কম না।

শ্রেয়া ঘোষাল আরো বলেন, এর আগেও একটি আইটেম গান গাওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁকে ভাবতে বাধ্য করেছিল। বলিউডের আরেকটি জনপ্রিয় গান ‘চিকনি চামেলি’ গাওয়ার পরই তাঁর বোধোদয় হয়। গানটি ছিল অগ্নীপথ ছবির, যেখানে পর্দায় নেচেছিলেন অভিনেত্রী ক্যাটরিনা কাইফ । গানটি সেই সময় দারুণ জনপ্রিয়তা পেলেও পরে শ্রেয়া উপলব্ধি করেন যে, একজন নারী শিল্পী হিসেবে এমন ধরনের গান গাওয়া তাঁর ব্যক্তিগত মূল্যবোধের সঙ্গে পুরোপুরি মানানসই নয়। এরপর থেকেই তিনি এমন গান থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নেন।

সংগীতজীবনে শ্রেয়া ঘোষালের জনপ্রিয়তার পরিধি বিশাল। হিন্দি সিনেমায় ‘তেরি মেরি’, ‘সুন্ন রহা হ্যায় না তু’, ‘দেওয়ানি মস্তানি’, ‘মনওয়া লাগে’, ‘বারসো রে’-এর মতো অসংখ্য গান তাঁকে এনে দিয়েছে কোটি ভক্ত। একইভাবে বাংলা সংগীতেও তাঁর অসাধারণ প্রভাব রয়েছে। ‘মন মাঝি রে’, ‘তুমি জানো না’, ‘ধীরে ধীরে’, ‘আমার মল্লিকা বনে’-এর মতো গান বাংলা শ্রোতাদের কাছে আজও সমান জনপ্রিয়। মধুর কণ্ঠ, নিখুঁত উচ্চারণ এবং আবেগঘন গায়কির জন্যই তিনি সব ভাষার শ্রোতার কাছে সমানভাবে সমাদৃত।
২০০২ সালে ছবির ‘বৈরি পিয়া’ গান দিয়ে বলিউডে অভিষেকের পর থেকেই তাঁর সাফল্যের যাত্রা শুরু। এরপর একের পর এক হিট গান, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং অসংখ্য সম্মাননা তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে সংগীতের শীর্ষস্থানে। তবে কেবল জনপ্রিয়তা নয়, নিজের মূল্যবোধ ও শিল্পীসত্তার প্রতি শ্রদ্ধাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছে। ‘ফেভিকল সে’ গানটি না গাওয়ার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই শ্রেয়া ঘোষাল আবারও প্রমাণ করেছেন-সত্যিকারের শিল্পী শুধু সুরে নয়, নীতিতেও বড় হন।