ফারহান তানভীর :
নতুন বছরের শুরুতেই ভারতীয় সংগীতজগতে এক ধরনের অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এসেছে। সেই নীরবতার কারণ অরিজিৎ সিং। ২৭ জানুয়ারি সন্ধ্যায় নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ পোস্টে তিনি জানান, এখন থেকে তিনি আর নতুন কোনো প্লেব্যাক গানের কাজ গ্রহণ করবেন না। শ্রোতাদের উদ্দেশে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে অরিজিৎ লেখেন, এটি ছিল তার জন্য “একটি সুন্দর যাত্রা”।

মাত্র কয়েকটি বাক্যের এই ঘোষণাই মুহূর্তের মধ্যে আলোড়ন তোলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।ঘোষণার পর টুইটার ও ইন্সটাগ্রাম খুললেই চোখে পড়ছে অরিজিতের গান, বিশেষ করে তার বিষণ্ন ও আবেগঘন গানগুলোর পুনরুত্থান। ‘তুম হি হো’, ‘চান্না মেরেয়া’, ‘আগর তুম সাথ হো’, ‘হামারি আধুরি কাহানি’, ‘এ দিল হ্যায় মুশকিল’, ‘ফির ভি তুমকো চাহুঙ্গা’, ‘শায়দ’, ‘সোচ না সাকে’-একটির পর একটি গান ঘিরে মানুষ নিজেদের ব্যক্তিগত স্মৃতি, না-পাওয়া আর ভাঙা ভালোবাসার গল্প শেয়ার করছেন। সিনেমার গানেই যে অরিজিত সিং একটি প্রজন্মের অনুভূতির ভাষা হয়ে উঠেছিলেন, তা আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।শুধু হিন্দি গানেই নয়, বাংলা সিনেমার গানেও অরিজিতের প্রভাব ছিল গভীর। ‘বোঝেনা সে বোঝেনা’, ‘কি করে তোকে বলবো’, ‘আমি তোমার কাছে’, ‘পারবো না ছাড়তে তোকে’, ‘তোর এক কথায়’, ‘এগিয়ে দে’, ‘আমার পরানো যাহা চায়’-এই গানগুলো বাংলাভাষী শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। ফলে তার এই সিদ্ধান্ত বলিউডের পাশাপাশি বাংলা চলচ্চিত্র অঙ্গনেও সমানভাবে আলোচিত হচ্ছে।

তবে অরিজিতের ঘোষণায় একটি বিষয় লক্ষণীয়-তিনি কোথাও ‘অবসর’ শব্দটি ব্যবহার করেননি। তিনি শুধু বলেছেন, নতুন কোনো প্লেব্যাক অ্যাসাইনমেন্ট আর নেবেন না। এ কারণেই অনেক সংগীতবোদ্ধা ও চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা একে চূড়ান্ত বিদায় নয়, বরং একটি বিরতি বা সৃজনশীল রূপান্তর হিসেবে দেখছেন। কারণ অরিজিত সিং শুধুই সিনেমার গায়ক নন; তিনি একজন স্বাধীন শিল্পীও। লাইভ কনসার্ট, ব্যক্তিগত সংগীতচর্চা, আধ্যাত্মিক গান-এসব ক্ষেত্রেও তার সক্রিয়তা বরাবরই চোখে পড়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে এসভিএফ প্রযোজক মহেন্দ্র সোনির মন্তব্য। অরিজিত প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, অরিজিতকে যেভাবে চিনি, তাকে আবার আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনা সহজ হবে না। একই সঙ্গে তিনি এটাও বলেছেন, অরিজিত নিজের সম্পূর্ণ শক্তি ও মনোযোগ দিয়ে এমন কিছু তৈরি করবেন, যা শুধু বিনোদনের জন্য নয়, বরং পৃথিবীর জন্যও অর্থবহ হবে। এই বক্তব্য অনেকটাই ইঙ্গিত দেয়, অরিজিতের এই সিদ্ধান্ত হঠাৎ আবেগের ফল নয়; বরং দীর্ঘদিনের ভাবনার ফল।এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সিনেমার গানই অরিজিত সিংকে অরিজিত করে তুলেছে। ‘তুম হি হো’ দিয়ে যে ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কোটি কোটি শ্রোতার জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল। প্রেম, বিচ্ছেদ, একাকিত্ব, আত্মসংঘাত-সব অনুভূতির নির্ভরযোগ্য কণ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। সেই জায়গা থেকে সিনেমার গান থেকে তার সরে দাঁড়ানো মানেই একটি বড় শূন্যতা।

তবে ইতিহাস বলছে, বড় শিল্পীরা কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যান না। তারা কখনো থামেন, কখনো দূরে দাঁড়িয়ে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলেন। অরিজিত সিংয়ের ক্ষেত্রেও হয়তো সেটাই ঘটছে। তিনি হয়তো আবার ফিরবেন সিনেমার গানে, হয়তো ফিরবেন একেবারে নতুন কোনো পথে-কিন্তু তার কণ্ঠ ও তার সৃষ্টি যে সহজে ভুলে যাওয়ার নয়, তা নিশ্চিত।এই মুহূর্তে অরিজিত সিংয়ের সিদ্ধান্তকে বিদায় হিসেবে দেখার চেয়ে অপেক্ষার সিদ্ধান্ত হিসেবেই দেখছেন অনেকেই। সিনেমার গানে তার অনুপস্থিতি অনুভূত হবে গভীরভাবে, কিন্তু সেই শূন্যতার মাঝেই হয়তো জন্ম নিচ্ছে নতুন কিছু। অরিজিত সিং থামছেন না-হয়তো তিনি শুধু একটু সময় নিচ্ছেন, আরও অর্থবহ হয়ে ফিরে আসার জন্য।