`ডিসি’ সিনেমা কি পারবে লোকেশের উপর ভক্তদের ক্ষোভ কমাতে?

ফারহান তানভীর :

লোকেশ কানাগারাজ দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমায় বর্তমানে এমন এক নাম, যিনি একদিকে নির্মাতা, অন্যদিকে একটি পুরো ইউনিভার্সের স্থপতি হিসেবে পরিচিত। ‘কাইথি’, ‘ভিক্রম’ ও ‘লিও’-এই তিনটি সিনেমার মাধ্যমে তিনি যে এলসিইউ বা লোকেশ সিনেমাটিক ইউনিভার্সের ভিত্তি তৈরি করেছেন, তা কলিউডের ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। এই ছবিগুলো শুধু সমালোচকদের প্রশংসাই পায়নি বরং বক্স অফিসে বিপুল সাফল্য এনে লোকেশকে ফ্র্যাঞ্চাইজ নির্মাতার কাতারে তুলে এনেছে।

এলসিইউ এর ক্যারেক্টর – এক্স থেকে

২০১৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘কাইথি’ দিয়ে শুরু হয়েছিল এই যাত্রা। কার্থির দিল্লি চরিত্র, এক রাতের অ্যাকশন-থ্রিলার ন্যারেটিভ এবং ড্রাগ কার্টেল থিম দর্শকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এরপর ২০২২ সালে ‘ভিক্রম’ মুক্তি পেয়ে এলসিইউকে মূলধারার আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। কমল হাসানের প্রত্যাবর্তন, সূরিয়ার রোলেক্স ক্যামিও এবং একাধিক ক্রসওভার চরিত্র দর্শকদের মধ্যে অভূতপূর্ব উন্মাদনা তৈরি করে এবং ছবিটি বছরের অন্যতম বড় হিটে পরিণত হয়। ২০২৩ সালে ‘লিও’ মুক্তি পেয়ে থালাপতি বিজয়ের স্টার পাওয়ার এবং এলসিইউ রেফারেন্সের কারণে প্যান-ইন্ডিয়া পর্যায়ে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং বক্স অফিসে বিশাল আয় করে।এই ধারাবাহিক সাফল্য এলসিইউকে একটি কাল্ট ফ্র্যাঞ্চাইজে পরিণত করেছে।

লোকেশ কানাগারাজ – বুম ডট কম

দর্শকরা ‘কাইথি ২’, ‘ভিক্রম ২’ এবং ‘রোলেক্স’ স্পিন-অফের মতো ভবিষ্যৎ প্রজেক্ট নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমস্যাও দেখা দেয়। বিভিন্ন সময়ে শোনা গেছে নতুন কাস্টিং যুক্ত হয়েছে, শুটিং শুরু হয়েছে, স্ক্রিপ্ট চূড়ান্ত-কিন্তু কিছুদিন পরই এসব খবর গুজব বলে প্রমাণিত হয়েছে। লোকেশ নিজেও এলসিইউ নিয়ে খুব কম আপডেট দেওয়ায় ফ্যানদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, ইউনিভার্স নিয়ে বড় প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তব অগ্রগতি ধীরগতির।এই প্রেক্ষাপটেই ভ্যালেন্টাইন্স ডেতে মুক্তি পেয়েছে লোকেশ অভিনীত নতুন সিনেমা ‘ডিসি’র গ্লিম্পস।

`ডিসি’ এর গ্লিম্পস – ইউটিউব থেকে

রোমান্টিক অ্যাকশন-থ্রিলার ঘরানার এই ছবিটি পরিচালনা করেছেন আরুণ মথেশ্বরান, যিনি ‘রকি’ ও ‘সানি কাইধাম’-এর মতো রাফ ও গ্রিটি সিনেমার জন্য পরিচিত। ছবিতে লোকেশের চরিত্রের নাম ‘দেবদাস’, তার সঙ্গে রয়েছেন ওয়ামিকা গাব্বি ও সঞ্জনা কৃষ্ণমূর্তি আর সংগীত পরিচালনায় অনিরুদ্ধ রবিচন্দ্রন। প্রযোজনা করেছে সান পিকচার্স এবং ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে মুক্তির লক্ষ্য রয়েছে।গুরুত্বপূর্ণভাবে উল্লেখযোগ্য যে, ‘ডিসি’ এলসিইউর অংশ নয়। এটি একটি সম্পূর্ণ স্ট্যান্ডঅ্যালোন প্রজেক্ট, যেখানে লোকেশ প্রথমবারের মতো প্রধান অভিনেতা হিসেবে হাজির হচ্ছেন।

`ডিসি’ এর গ্লিম্পস – ইউটিউব থেকে

গ্লিম্পস মুক্তির পর সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেক ফ্যান লিখেছে, অনিরুদ্ধ আবারও একটি শক্তিশালী ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর দিয়েছেন এবং ভিজুয়াল টোন বেশ ইন্টারেস্টিং। কেউ কেউ বলছে, লোকেশের ওপর এলসিইউ নিয়ে ক্ষোভ থাকলেও তার নতুন সিনেমার কনটেন্ট এখন পর্যন্ত প্রমিজিং। গ্লিম্পসে গল্পের ধরন স্পষ্ট নয়-এটা রিভেঞ্জ-ভিত্তিক নাকি হাইস্ট-টাইপ কোনো ন্যারেটিভ!এই রহস্য দর্শকদের কৌতূহল আরও বাড়িয়েছে।সোশ্যাল মিডিয়ায় মজার পোস্টও ভাইরাল হচ্ছে। একটি জনপ্রিয় পেজ লিখেছে, “প্রথম মুভিতে দুই নায়িকার সাথে রোম্যান্স। হিরো হওয়ার জন্য লোকেশের আর কি কারণ লাগবে ।” এই ধরনের পোস্ট লোকেশের ‘ডিরেক্টর থেকে কমার্শিয়াল হিরো’ ট্রানজিশন নিয়ে হাস্যরসাত্মক মন্তব্য হলেও, এটি দেখাচ্ছে যে দর্শকরা তাকে এখন পুরোপুরি একজন মেইনস্ট্রিম নায়ক হিসেবেই দেখতে শুরু করেছে। দুই নায়িকার সঙ্গে রোমান্সের বিষয়টি কমার্শিয়াল সিনেমার চিরাচরিত হিরো ইমেজকে আরও শক্ত করছে।

`ডিসি’ এর গ্লিম্পস – ইউটিউব থেকে

লোকেশ এতদিন ক্যামেরার পেছনের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে পরিচিত ছিল, কিন্তু ‘ডিসি’তে তিনি ক্যামেরার সামনে এসে নিজের নতুন পরিচয় তৈরি করছেন। যদি ‘দেবদাস’ চরিত্রটি দর্শকদের মনে জায়গা করে নিতে পারে, তাহলে লোকেশের স্টার ভ্যালু সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা পেতে পারে, যা ভবিষ্যতে তার পরিচালিত সিনেমার হাইপেও প্রভাব ফেলবে।শেষ পর্যন্ত এলসিইউ নিয়ে ফ্যানদের ক্ষোভ মূলত প্রত্যাশা ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা থেকে এসেছে। লোকেশ একটি বিশাল ইউনিভার্সের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, কিন্তু নিয়মিত আপডেট ও দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় সেই স্বপ্ন আপাতত ঝুলে আছে। ‘ডিসি’র গ্লিম্পস দেখাচ্ছে, লোকেশ এখনো সিনেমার কেন্দ্রেই আছে, তবে ভিন্ন ভূমিকায়।

এই সিনেমার সাফল্য তার ক্যারিয়ারে একটি নতুন অধ্যায় শুরু করতে পারে, আর এলসিইউ ফ্যানদের জন্যও একটি বার্তা দেবে-লোকেশ কানাগারাজ এখনও খেলায় আছে, যদিও আপাতত ইউনিভার্সের চেয়ে নিজের স্টার ইমেজ নির্মাণেই বেশি মনোযোগী।এখন দেখার বিষয় ফলাফল কি বলে!