জুবিনের মৃত্যুতে শোক আর প্রশ্নে স্তব্ধ আসাম!

মেহেদী হাসান:

২০০৬ সালে অনুরাগ বসুর ছবি গ্যাংস্টার-এর মাধ্যমে বলিউডে আলাদা জায়গা করে নিয়েছিলেন জুবিন গার্গ। সিনেমাটি আলোচনায় থাকলেও, সবচেয়ে বেশি হৃদয় ছুঁয়েছিল গান ইয়া আলী। কলেজ ক্যানটিন, হোস্টেলের আড্ডা থেকে রাতের বাস-সব জায়গায় বাজতে থাকে গানটি। এক প্রজন্মের বেড়ে ওঠা যেন তাঁর কণ্ঠের সঙ্গে গাঁথা হয়ে যায়।শুধু যে এই একটা গানেই মানুষ তাঁকে চিনেছে তা নয়।মন মানে না,এক মুঠো স্বপ্ন চেয়ে,মন তোকে দিলাম,খুদা জানে,সোনিয়ে তু,তোরে নিয়ে যাই,প্রেম কি বুঝিনি,হরি দিন তো গেলো,লাভ ইউ সোনিও,তোমার আমার প্রেম সহ আরো অনেক জনপ্রিয় গান গেয়ে তিনি দর্শকদের মনে জায়গা করে নিয়েছেন।জুবিনের হঠাৎ মৃত্যুর খবর যেন আসামবাসীর বুক থেকে রক্ত শুষে নেয়।

স্টেজে জুবিন গার্গ

সিঙ্গাপুরে ছুটি কাটাতে গিয়ে সাঁতার কাটার সময় খিঁচুনিতে আক্রান্ত হয়ে পানিতে ডুবে প্রাণ হারান এই জনপ্রিয় শিল্পী। রোববার সকালে তাঁর মরদেহ গুয়াহাটি পৌঁছালে পুরো শহর থমকে যায়। লোকপ্রিয় গোপীনাথ বরদলই বিমানবন্দর থেকে কাহিলিপাড়া পর্যন্ত ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পথে হাজারো মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রিয় শিল্পীকে শেষবার দেখার জন্য। ফুলে সাজানো অ্যাম্বুলেন্স সাধারণত আধা ঘণ্টার পথ অতিক্রম করতে পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় নেয়। শহরের দোকানপাট, হোটেল, এমনকি খাবার ডেলিভারি সার্ভিসও বন্ধ হয়ে যায়। অনেকে এটিকে আখ্যা দেন “ব্ল্যাক ডে”।

গুয়াহাটির শিল্পী রূপম মুদই জানান, “প্রতিটি দোকানের সামনে ধূপ জ্বালানো, ফুলে সাজানো স্টল-এমন ভালোবাসা খুব কম শিল্পীই পেয়েছেন।” তবে স্থানীয় সাংবাদিক অনিতা গোস্বামীর মতে, “শ্রদ্ধা আন্তরিকভাবে হওয়া উচিত, জোর করে দোকান বন্ধ করানো ঠিক নয়।”

জুবিন গার্গের শবযাত্রা

শোকে স্তব্ধ আসামবাসীর পাশাপাশি গায়কের মৃত্যু নিয়ে প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে। কারণ, ঘটনাটির আগে প্রকাশিত একটি ভিডিও নতুন করে বিতর্ক ছড়িয়েছে। সেখানে দেখা যায়, জুবিনকে বারবার পানিতে নামতে বলছেন শেখর গোস্বামী। জুবিন একপর্যায়ে বলেন, শেখরই একসময় তাঁকে সাঁতার শিখিয়েছিলেন। শেখর আশ্বাস দেন, “জলে নামলে কিছু হবে না।” ভিডিওতে আরও দেখা যায়, একজন তাঁকে লাইফ জ্যাকেট দিতে চাইলে তিনি তা নিতে অস্বীকার করেন।গায়কের ঘনিষ্ঠজনদের দাবি, তিনি পানিতে নামতে ভয় পেতেন। তা সত্ত্বেও কেন তাঁকে স্কুবা ডাইভিং করতে উৎসাহ দেওয়া হলো, কেন পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নেওয়া হলো না-তা নিয়ে সমালোচনা চলছে। ঘটনার আগের রাতে তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলে একটি পার্টির আয়োজনও হয়েছিল, যেখানে মদ্যপান হয় বলে জানা গেছে। এর পরদিনই ঘটে এই মর্মান্তিক ঘটনা।

প্রিয় গায়কের শেষ বিদায়ে লাখো ভক্তের ঢল

গুয়াহাটির কাহিলিপাড়ায় কফিনে করে আনা হলে পরিবারকে ঘিরে তৈরি হয় নিরাপত্তাবলয়। প্রিয় খোলা জিপ, যেটিতে কনসার্টে যেতেন, তাতেই রাখা হয় তাঁর বড় ছবি। ভক্তরা মশাল, মোমবাতি হাতে এগিয়ে চলছিলেন, গাইছিলেন তাঁর প্রিয় গান মায়াবিনী-যা মৃত্যুর পর বাজানোর ইচ্ছা তিনি নিজেই প্রকাশ করেছিলেন।তিন দশকের ক্যারিয়ারে ৪০টির বেশি ভাষা ও উপভাষায় ৩৮ হাজারের বেশি গান উপহার দিয়েছেন জুবিন গার্গ। শুধু একজন গায়ক নন, তিনি ছিলেন আসামের সাংস্কৃতিক অহংকার।

হাস্যোজ্জ্বল জুবিন

মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা ও কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী পবিত্র মার্ঘেরিটা বিমানবন্দরে মরদেহ গ্রহণ করতে উপস্থিত ছিলেন। স্ত্রী গারিমা শইকিয়া গার্গ ভেঙে পড়েন কফিন জড়িয়ে ধরে।সরকার এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি, তাঁর শেষকৃত্য গুয়াহাটির কাছে সোনাপুরে নাকি জোরহাটে হবে। ভক্তরা স্মৃতিসৌধ চান, আবার পরিবারের পক্ষ থেকে বাবার যাতায়াতের কষ্ট নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। প্রকৌশলী মিমলি বরদলইয়ের ভাষায়, “আসাম এক অমূল্য রত্ন হারাল। আর কখনো তাঁর মতো কেউ আসবেন না।”

এক প্রজন্মের বড় হওয়া, ভালোবাসা আর স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কণ্ঠস্বরটি চিরদিনের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেও, তাঁর গান, তাঁর ছায়া আর তাঁর সাংস্কৃতিক অবদান অমর হয়ে থাকবে। কিন্তু সেই সঙ্গে থেকে যাচ্ছে এক কঠিন প্রশ্ন-এ মৃত্যু কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি অবহেলার ফল?

Leave a Comment