ফারহান তানভীর :
ফুটবলের মাঠ থেকে বাংলা সিনেমার রূপালি দুনিয়ায় পা রাখা মানুষটির নাম নজরুল ইসলাম শামীম। তবে দর্শকের কাছে তিনি কেবল একজন অভিনেতা নন-তিনি কাবিলা। এক সময় যার উপস্থিতি মানেই হলে হাসির রোল, সংলাপে বরিশালের টান, চোখেমুখে একধরনের দুষ্টুমি। চার দশকেরও বেশি সময়জুড়ে বাংলা চলচ্চিত্রে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অনিবার্য এক নাম। ভিলেন চরিত্র দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৌতুক চরিত্রে নিজের এমন এক জায়গা তৈরি করেন, যা খুব কম অভিনেতার পক্ষেই সম্ভব হয়েছে।

১৯৮৮ সালে কাজী হায়াত পরিচালিত ‘যন্ত্রণা’ চলচ্চিত্রে খল চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে সিনেমায় তার অভিষেক। সে ছবিতে প্রধান ভিলেন ছিলেন রাজীব, তার সঙ্গে আরও কয়েকজন খলনায়কের একজন ছিলেন কাবিলা। প্রথম ছবিতেই দর্শক ও নির্মাতাদের নজর কাড়েন তিনি। নিজের স্মৃতিচারণায় কাবিলা বলেন, প্রথম ছবির পরই পরিচিতি বাড়তে থাকে, আর তখন থেকেই কাজের আর কোনো অভাব হয়নি। কাজী হায়াতের বন্ধু-বান্ধব যাঁরা পরিচালক ছিলেন, তাঁরা একের পর এক ছবিতে তাকে নেওয়া শুরু করেন। তাদের কথায়, “ছেলেটা তো ভালোই করছে।” সেখান থেকেই শুরু হয় এক দীর্ঘ যাত্রা।

চার দশকের ক্যারিয়ারে প্রায় সাতশ’র মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন বলে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে উল্লেখ পাওয়া যায়। শুরুতে নেতিবাচক ও ভিলেন চরিত্রে বেশি দেখা গেলেও ধীরে ধীরে তিনি কৌতুক অভিনেতা হিসেবেই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তার কণ্ঠে বরিশালের আঞ্চলিক ভাষা যেন আলাদা এক মাত্রা যোগ করেছিল বাংলা সিনেমায়। সংলাপ বলার ভঙ্গি, হাঁটাচলা, পোশাক, চোখের ভাষা-সব মিলিয়ে পর্দায় এলেই দর্শক হাসিতে ভেঙে পড়তেন। পরিচালক ও প্রযোজকদের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এমন একজন অভিনেতা, যাকে ছাড়া নির্দিষ্ট ধাঁচের ছবি কল্পনাই করা যেত না।কিন্তু হঠাৎ করেই সেই কণ্ঠের পতন।
দীর্ঘদিন ধরে কাবিলা ভুগছেন গুরুতর কণ্ঠ সমস্যায়। ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলে হেফাজতে ইসলাম ও পুলিশের সংঘর্ষের সময় ভোরবেলায় মর্নিং ওয়াকে বের হয়ে পড়েন তিনি। সেই সময় একটি রাবার বুলেট এসে তার গলায় লাগে। বাইরে থেকে প্রথমে তেমন গুরুতর মনে না হলেও পরে বোঝা যায়, গলার ভেতরে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। ভেতরে ঘা তৈরি হয়, কথা বলতে শুরু করেন কষ্ট করে। চিকিৎসা করতে গিয়ে ধরা পড়ে আরও ভয়াবহ সত্য-তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত।এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য ব্যাংককে যেতে হয় তাকে। দীর্ঘ চিকিৎসার পর ক্যানসার থেকে মুক্তি পেলেও কণ্ঠ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। এক সময় তিনি একেবারেই কথা বলতে পারতেন না। বর্তমানে কিছুটা উন্নতি হয়েছে, ধীরে ধীরে কণ্ঠ ফিরছে বলে জানান তিনি। তার কথায়, “আগে কথা বলতে পারতাম না, মোটেও পারতাম না। এখন আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাচ্ছে। ইনশাল্লাহ সবার দোয়ায় আবার কণ্ঠ ঠিক হয়ে যাবে।” তবে এখনও সিনেমায় অভিনয় করলে তার চরিত্রে অন্য কাউকে দিয়ে কণ্ঠ দিতে হয়-যা একজন কণ্ঠনির্ভর অভিনেতার জন্য বড় এক বাস্তবতা।

সিনেমার মানুষ হলেও ফুটবল কখনোই ভুলে যাননি কাবিলা। মূলত একজন ফুটবলার হিসেবেই তার জীবন শুরু। ঢাকায় তার প্রথম ক্লাব ছিল ব্রাদার্স ইউনিয়ন। ১৯৭৫ সালে ক্লাবে যোগ দেন, ১৯৭৭ সাল থেকে নিয়মিত খেলেন এবং ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত ফুটবল মাঠে সক্রিয় ছিলেন। পরবর্তীতে আরামবাগ ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হন এবং বর্তমানে সেই ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এখনও নিয়মিত ফুটবল অনুশীলন করেন তিনি, মাঠের সঙ্গে তার সম্পর্ক আজও অটুট।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে চলচ্চিত্রের ধারা, বদলেছে দর্শকের অভ্যাস। তবুও কাবিলা স্বপ্ন দেখেন বাংলা সিনেমার সোনালি অতীত আবার ফিরবে। হলে হলে দর্শকের ভিড় জমবে, বড় পর্দায় ফিরে আসবে সেই চিরচেনা মুহূর্তগুলো, যেখানে হাসি-কান্না-সংলাপে দর্শক হারিয়ে যেত। নানা শারীরিক সীমাবদ্ধতা আর কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও এই অভিনেতা এখনো আশাবাদী-একদিন হয়তো আবারও কণ্ঠের জাদুতে দর্শককে মাতাতে পারবেন কাবিলা।