ফারহান তানভীর :
বাংলাদেশি সিনেমার ইতিহাসে মান্না কেবল একজন জনপ্রিয় নায়ক নন, তিনি ছিলেন ভরসার নাম। এমন একজন মানুষ, যিনি ক্যামেরার সামনে যেমন দায়িত্বশীল ছিলেন, তেমনি ক্যামেরার পেছনেও ছিলেন সাহসী ও উদার। দোজ্জাল শাশুড়ি, রিকশাওয়ালার প্রেম, চাকরের প্রেম, তছনচ-এর মতো দর্শকপ্রিয় সিনেমার পরিচালক রাকিবুল আলম রকিবের একটি সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে তেমনই এক অজানা গল্প-যে গল্পে আছে কয়েকটি সিনেমা, যেগুলো চাইলেও আর করে যেতে পারেননি মান্না।

রাকিবুল আলম রকিব তখন ব্যস্ত ছিলেন সিনেমার এডিটিংয়ের কাজে। হঠাৎ ফোন আসে মান্নার। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মান্না জানতে চান, ‘বাবা কই তুমি?’ রকিব জানান, তিনি এডিটিংয়ে আছেন। এরপর আর সময় নষ্ট না করে মান্না সরাসরি বলেন, ব্যাংক থেকে পাঁচ লাখ টাকা তুলে সাভারে ডিপজল ভাইয়ের বাসায় আসতে।কোনো প্রশ্ন না করে, কোনো ব্যাখ্যা না চেয়ে রকিব ব্যাংক থেকে টাকা তুলে সাভারের উদ্দেশে রওনা দেন। সেখানে তখন শুটিংয়ে ব্যস্ত মান্না ও ডিপজল।

রকিবকে দেখেই মান্না বলেন, ‘মেকআপ রুমে অপু বিশ্বাস আছে। এই পাঁচ লাখ টাকা ওকে দিয়ে পাঁচটা ছবির সাইন করিয়ে নাও।’রকিব একটু থমকে যান। তিনি মান্নাকে বলেন, আমার তো সব সিনেমাই রানিং। অপু বিশ্বাসকে নেওয়ার জায়গা কোথায়? মান্না জবাবে বলে-‘ওটা নিয়ে ভাবতে হবে না। তুমি শুধু সাইন করিয়ে আনো।’রকিব শেষ পর্যন্ত অপু বিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলেন। টাকা দেওয়া হয়, পাঁচটি ছবির চুক্তিও সাইন হয়। কাজ শেষ করে ফের মান্নার কাছে এলে তিনি বলেন, ‘আমি জানি, আগামী এক মাসের মধ্যেই এই ছবিগুলো তোমার কাছে চলে আসবে। আর যদি না আসে, তাহলে আমি তো আছিই।’আবেগঘন কন্ঠে রকিব বলেন ‘আমি তো আছিই’-এই কথাটাই যেন আজ সবচেয়ে বেশি কানে বাজে।

এই চুক্তির কিছুদিন পর আবার মান্না রকিবকে আবার ডেকে পাঠান। এবার প্রসঙ্গ ছিল অন্য। রকিবের একটি সিনেমার স্ক্রিপ্ট তাঁর খুব ভালো লেগেছে। সেখানে মান্নার শিডিউল ছিল চার মাস পর। কিন্তু মান্না নিজেই বলেন, তিনি শিডিউল এগিয়ে এনে এখনই সিনেমাটার শুটিং করবেন।সেই দিন আড্ডা, পরিকল্পনা আর ভবিষ্যতের স্বপ্নে কেটে যায়। মান্না ফিরে যান শুটিংয়ে, আর রকিব ফিরে যান নিজের বাসায়-পরবর্তী কাজের প্রস্তুতি নিতে।কিন্তু পরদিন সকালটা আর সাধারণ থাকেনি।সকালে হঠাৎ রকিবের এডিটর ফোন করে জানান, মান্না আর নেই।এক মুহূর্তে সব থেমে যায়। অপু বিশ্বাসের সঙ্গে করা সেই পাঁচটি সিনেমা, রকিবের নিজের যে সিনেমাটার শিডিউল এগিয়ে আনার কথা হয়েছিল-একটিও আর বাস্তবে রূপ নেয়নি।

এই সিনেমাগুলো কখনো শুটিং ফ্লোরে যায়নি, পোস্টারে জায়গা পায়নি, দর্শকের মুখে নাম ওঠেনি। তবু এগুলো মান্নার গল্পের অংশ। কারণ এগুলো প্রমাণ করে, মান্না শুধু নিজের ক্যারিয়ার নয়, অন্যদের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবতেন।কিছু সিনেমা না হওয়া হয়তো ইতিহাস বদলায় না। কিন্তু কিছু মানুষ অসময়ে চলে গেলে, অনেক গল্প চিরকাল অপূর্ণই থেকে যায়।