ঘোষণা হয়েছে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার -২০২৩! কি বলছেন দর্শকরা?

ফারহান তানভীর :

২০২৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের তালিকা প্রকাশের পর থেকেই দর্শক মহলে তৈরি হয়েছে তুমুল উত্তেজনা। বৃহস্পতিবার রাতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন জারির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের আড্ডা-সবখানেই চলছে আলোচনা, তর্ক আর বিশ্লেষণ। কারও মতে এবার সঠিক বিচার হয়েছে, আবার অনেকের চোখে এই তালিকায় রয়েছে প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত।

এবারের আসরের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে ‘সাঁতাও’। সেরা চলচ্চিত্র নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি ছবিটির নির্মাতা খন্দকার সুমন পেয়েছেন সেরা পরিচালকের পুরস্কার। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো-এটি তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। প্রথম সিনেমাতেই এমন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি অনেকের কাছেই বিস্ময়কর ও আশাব্যঞ্জক। মোট চারটি বিভাগে পুরস্কার পেয়ে ‘সাঁতাও’ প্রমাণ করেছে, নতুন নির্মাতার হাতেও শক্তিশালী গল্প ও নির্মাণ সম্ভব।

“সাঁতাও” সিনেমার পোস্টার – ম্যাক্রো নিউজ

তবে সংখ্যার দিক থেকে এবারের পুরস্কার আসরে সবচেয়ে এগিয়ে রায়হান রাফী পরিচালিত ‘সুড়ঙ্গ’। সিনেমাটি পেয়েছে সর্বোচ্চ আটটি বিভাগে পুরস্কার। এই ছবির মাধ্যমেই বড় পর্দায় অভিষেক হওয়া আফরান নিশো জিতেছেন সেরা অভিনেতার পুরস্কার। এখান থেকেই মূলত শুরু হয় সবচেয়ে বড় বিতর্ক।একদল দর্শকের মতে, ‘সুড়ঙ্গ’-এ নিশোর অভিনয় ছিল সংযত, নিয়ন্ত্রিত এবং চরিত্রনির্ভর। তারা বলছেন, প্রথম সিনেমাতেই এমন পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি পাওয়া একেবারেই যৌক্তিক। তাদের ভাষায়, “এটা প্রমাণ করে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এখন তারকাখ্যাতির চেয়ে অভিনয়কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।”কিন্তু বিপরীত পক্ষের বক্তব্যে উঠে আসে আরেকটি নাম-শাকিব খান। তাদের দাবি, ‘প্রিয়তমা’ সিনেমায় শাকিব খানের পারফরম্যান্স ছিল বছরের অন্যতম সেরা। অভিজ্ঞতা, আবেগপ্রবণ অভিনয় এবং দর্শক গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে তিনি এবছর সেরা অভিনেতার পুরস্কার ডিজার্ভ করতেন বলে মনে করেন অনেকে।তবে সেরা অভিনেতার পুরস্কার শাকিব খানের ঝুলিতে না গেলেও, তাঁর অভিনীত ‘প্রিয়তমা’ সিনেমাটি একেবারে উপেক্ষিত থাকেনি। বরং ছবিটি পাঁচটি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়ায় অনেক দর্শকের মতে, এটি শাকিব খানের কাজেরই এক ধরনের পরোক্ষ স্বীকৃতি। এই জায়গাটাই নিশো-শাকিব বিতর্কে কিছুটা ভারসাম্য এনে দিয়েছে।

“সুড়ঙ্গ” সিনেমার পোস্টার – আইএমডিবি

নারী অভিনয়ে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছেন আইনুন পুতুল-‘সাঁতাও’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য। এটি তাঁর প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। কেউ কেউ এই সিদ্ধান্তকে সাহসী ও সময়োপযোগী বললেও, আবার কেউ প্রশ্ন তুলেছেন-আরও আলোচিত নাম থাকা সত্ত্বেও এই নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য।আজীবন সম্মাননা বিভাগে অবশ্য তেমন দ্বিমত নেই। প্রয়াত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও প্রয়াত চিত্রগ্রাহক ও নির্মাতা আবদুল লতিফ বাচ্চু যুগ্মভাবে এই সম্মাননায় ভূষিত হচ্ছেন। দর্শক ও চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টদের মতে, এটি দেরিতে হলেও একেবারে সঠিক সিদ্ধান্ত।

“ও প্রিয়তমা” গানের থাম্বনেইল – ইউটিউব

অন্য বিভাগগুলোতেও ছিল ভারসাম্যপূর্ণ উপস্থিতি। পার্শ্ব চরিত্রে মনির আহাম্মেদ শাকিল (‘সুড়ঙ্গ’) ও নাজিয়া হক অর্ষা (‘ওরা সাত জন’), খল চরিত্রে আশীষ খন্দকার (‘অ্যাডভেঞ্চার অব সুন্দরবন’), কৌতুক চরিত্রে শহীদুজ্জামান সেলিম (‘সুড়ঙ্গ’)-এসব নির্বাচন অভিনয়ের বৈচিত্র্যকে সামনে এনেছে। শিশু শিল্পী বিভাগে ‘আম কাঁঠালের ছুটি’ ছবির দুই শিল্পীর পুরস্কার পাওয়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।

সব মিলিয়ে, এবারের পুরস্কার তালিকায় কয়েকটি সিনেমা স্পষ্টভাবে আধিপত্য দেখিয়েছে-‘সুড়ঙ্গ’ (৮টি), ‘প্রিয়তমা’ (৫টি) এবং ‘সাঁতাও’ (৪টি বিভাগে)। এই সংখ্যাগুলোই বলে দিচ্ছে কোন ছবিগুলো ২০২৩ সালে শিল্প ও দর্শক-দুই দিক থেকেই প্রভাব ফেলতে পেরেছে।জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০২৩ তাই শুধু বিজয়ীদের তালিকা নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে বাংলা সিনেমার বর্তমান বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

“আম কাঁঠালের ছুটি” সিনেমার পোস্টার – আইএমডিবি

দর্শক এখন প্রশ্ন করে, তুলনা করে, বিতর্কে জড়ায়। আর সেই বিতর্কের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে দুটি নাম-নিশো ও শাকিব খান।এই তর্ক চলবে, মতভেদ থাকবে-কিন্তু বহুদিন পর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার যে আবার দর্শকের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরেছে, সেটাই হয়তো এবারের সবচেয়ে বড় অর্জন।