ফারহান তানভীর :
বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের ইতিহাসে জাফর ইকবাল এমন এক নাম, যিনি শুধুই নায়ক ছিলেন না-তিনি ছিলেন সময়কে প্রতিনিধিত্ব করা এক জীবনধারা। স্টাইল, আধুনিকতা, সংগীত আর আবেগ-সবকিছুর এক অদ্ভুত মিশেল ছিল তাঁর মধ্যে। ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে ঢালিউড যে নতুন মুখ, নতুন রুচি আর নতুন দর্শক পেয়েছিল, তার পেছনে জাফর ইকবালের অবদান অনস্বীকার্য।

জাফর ইকবালের জন্ম ১৯৫০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। খুব অল্প বয়স থেকেই তিনি সংগীতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। চলচ্চিত্রে আসার আগেই তাঁর পরিচয় ছিল একজন গায়ক হিসেবে। প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে তাঁর যাত্রা ঠিক কোন সিনেমা দিয়ে শুরু-এ নিয়ে মতভেদ আছে। কারো মতে ‘পিচ ঢালা পথ’, আবার কারো মতে ‘বদনাম’ সিনেমার মাধ্যমে তিনি প্রথম প্লেব্যাকে কণ্ঠ দেন। তবে এ বিষয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট-সংগীতই ছিল তাঁর শিল্পীসত্তার প্রথম দরজা।মাত্র ১৯ বছর বয়সে ‘আপন পর’ সিনেমার মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয়ে অভিষেক করেন। শুরুতে তিনি নায়ক হিসেবে নয়, বরং একজন সম্ভাবনাময় নতুন মুখ হিসেবেই দর্শকের সামনে আসেন। ধীরে ধীরে নিজেকে প্রস্তুত করেন বড় জায়গার জন্য। সেই জায়গাটা তিনি পাকাপোক্তভাবে দখল করেন ১৯৭৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মাস্তান’ সিনেমার মাধ্যমে। এই সিনেমার পরই জাফর ইকবাল ঢালিউডে পূর্ণাঙ্গ নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন এবং দর্শকের চোখে তিনি হয়ে ওঠেন নির্ভরযোগ্য তারকা।

জাফর ইকবাল ছিলেন সময়ের তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক। তিনি র্যাম্বলিং স্টোন নামে একটি ব্যান্ড গঠন করেন, যা তখনকার বাংলাদেশে ছিল বেশ সাহসী উদ্যোগ। গিটার হাতে গান গাওয়া, পাশ্চাত্য সংগীতের প্রভাব-সব মিলিয়ে তিনি তরুণ সমাজের কাছে হয়ে ওঠেন আলাদা এক আইকন। এই আধুনিকতা তাঁর চলচ্চিত্রের চরিত্রেও প্রতিফলিত হতো। তাই তাঁকে বলা হতো ঢালিউডের সবচেয়ে স্টাইলিশ নায়ক।অভিনয় জীবনে তিনি প্রায় দেড় শতাধিক সিনেমায় কাজ করেন। এর মধ্যে নায়িকা ববিতার সঙ্গে তাঁর জুটি ছিল সবচেয়ে আলোচিত ও জনপ্রিয়। শোনা যায়, ববিতার সঙ্গে তিনি প্রায় ৩০টি সিনেমায় জুটি বেঁধেছেন।

পর্দায় এই জুটি যেমন দর্শকপ্রিয় ছিল, তেমনি পর্দার বাইরেও তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে ছিল নানা আলোচনা। জনশ্রুতি রয়েছে, জাফর ইকবাল নাকি ববিতাকে ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করতেন। কিন্তু ববিতা অন্যত্র বিয়ে করায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন-এমন কথাও প্রচলিত আছে।এই আবেগেরই প্রতিফলন দেখা যায় ‘কেন তুমি কাঁদালে’ নামের একটি গানের এলবামে। এই এলবামকে অনেকেই জাফর ইকবালের জীবনের সবচেয়ে ব্যক্তিগত শিল্পকর্ম বলে মনে করেন। শোক, অভিমান আর না-পাওয়ার বেদনা যেন এই গানের প্রতিটি লাইনে মিশে আছে। যদিও এসব কথা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়, তবু তাঁর জীবনের সঙ্গে এই গল্পগুলো জড়িয়ে গেছে মানুষের মুখে মুখে।

অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি প্রযোজক হিসেবেও কাজ করেছেন। ‘প্রেমিক’ নামে একটি সিনেমা তিনি নিজেই প্রযোজনা করেন। এটি প্রমাণ করে, জাফর ইকবাল শুধু ক্যামেরার সামনে নয়, চলচ্চিত্র নির্মাণের সামগ্রিক প্রক্রিয়াতেও আগ্রহী ছিলেন।১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অংশগ্রহণ তাঁর ব্যক্তিত্বের আরেকটি শক্ত দিক তুলে ধরে। একজন জনপ্রিয় শিল্পী হয়েও দেশের প্রয়োজনে যুদ্ধে অংশ নেওয়া তাঁকে কেবল তারকা নয়, একজন দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবেও স্মরণীয় করে রেখেছে।

তবে তাঁর জীবন সবসময় আলোয় ভরা ছিল না। অনিয়মিত জীবনযাপন, মানসিক চাপ এবং অতিরিক্ত কাজ ধীরে ধীরে তাঁর শরীরকে দুর্বল করে তোলে। শেষ পর্যন্ত তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং ১৯৯২ সালের ৮ জানুয়ারি মাত্র ৪১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর অকাল মৃত্যু ঢালিউডকে শোকস্তব্ধ করে দেয়। অনেকেই মনে করেন, তিনি আরও বহু বছর বেঁচে থাকলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আরও সমৃদ্ধ হতো।
জাফর ইকবাল আজ আর নেই, কিন্তু তিনি রয়ে গেছেন তাঁর সিনেমা, গান আর স্মৃতিতে। তিনি ছিলেন এমন এক নায়ক, যাঁর জীবনে ছিল সাফল্য, ভালোবাসা, বেদনা ও অপূর্ণতার গল্প-ঠিক একজন মানুষের মতোই। আর সেই মানবিকতার কারণেই জাফর ইকবাল আজও কিংবদন্তি।