ফারহান তানভীর :
দক্ষিণ ভারতের কিংবদন্তি অভিনেতা রজনীকান্ত শুধু পর্দার নায়ক নন, বাস্তব জীবনেও তিনি এক অনন্য প্রেরণা। খ্যাতি, অর্থ, জনপ্রিয়তা-সবই তাঁর হাতের মুঠোয়। অথচ এত অর্জনের পরও তিনি যে কতটা সাধারণ, কতটা মাটির মানুষ, তা বারবারই প্রমাণ করেন নিজের আচরণে, জীবনযাপনে। সম্প্রতি তাঁর হিমালয় সফরের ছবিগুলো আবারও মনে করিয়ে দিল-আসল তারকাজ্যোতি থাকে বিনয় আর সরলতার মধ্যেই।

রজনীকান্ত গিয়েছিলেন উত্তর ভারতের হিমালয় পাদদেশে অবস্থিত পবিত্র স্থান ঋষিকেশে, একান্ত আধ্যাত্মিক যাত্রায়। ব্যস্ত শুটিং সূচি ও আলো ঝলমলে জীবনের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে তিনি বেরিয়ে পড়েছিলেন শান্তির খোঁজে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক ছবিতে দেখা যায়, সাদা সাধারণ পোশাকে তিনি বসে আছেন পাহাড়ি এক রাস্তার ধারে। পাথরের ওপর পাতালে রাখা খাবার সামনে, আর তিনি ধীরস্থিরভাবে খাচ্ছেন। পাশে পার্ক করা একটি গাড়ি, পেছনে পাহাড়ের মনোরম দৃশ্য-সব মিলিয়ে ছবিটিতে মিশে আছে এক আশ্চর্য প্রশান্তি। এই একটিমাত্র ছবিই যেন তাঁর জীবনের দর্শন প্রকাশ করে-খ্যাতি নয়, সরলতাই সত্যিকারের মহত্ব।

জানা গেছে, এই সফরে রজনীকান্ত গিয়েছিলেন স্বামী দয়ানন্দ আশ্রমে। সেখানে তিনি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন স্বামী দয়ানন্দকে এবং গঙ্গাতীরে বসে ধ্যান করেন দীর্ঘক্ষণ। সন্ধ্যায় অংশ নেন গঙ্গা আরতিতে, যা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এক গভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা। আশ্রমে থাকা অবস্থায় তিনি পুরোহিত ও স্থানীয় ভক্তদের সঙ্গে গল্প করেছেন, খোঁজ নিয়েছেন তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের। একাধিক ছবিতে দেখা গেছে তাঁকে সাধারণ ভক্তের মতো মাটিতে বসে কথা বলতে। তাঁর মুখে সর্বক্ষণ সেই পরিচিত শান্ত হাসি-যা বলে দেয়, রজনীকান্তের ভেতরকার প্রশান্তি তাঁর বাইরের জৌলুসের চেয়েও অনেক বড়।

ঋষিকেশের পর তিনি গিয়েছিলেন উত্তরাখণ্ডের দ্বারাহাটে, যেটি হিমালয়ের কোলে অবস্থিত আরেকটি ধ্যানকেন্দ্র। সেখানেও তিনি কিছুদিন ছিলেন নিভৃতে। হিমালয়ের নির্জন পরিবেশ, গঙ্গার পবিত্র ধারা-সব মিলিয়ে তিনি নিজের অন্তর্জগতে ফিরে যান। বহু বছর ধরে রজনীকান্ত নিয়মিতভাবেই এ ধরনের আধ্যাত্মিক সফরে যান। এটি তাঁর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যেখান থেকে তিনি শক্তি ও প্রেরণা সংগ্রহ করেন।

এই সফরের মাঝেও তিনি ভুলে যাননি সমাজের প্রতি নিজের দায়িত্ববোধ। সম্প্রতি তামিলনাড়ুর কারুরে অভিনেতা-রাজনীতিক বিজয়ের আয়োজিত একটি রাজনৈতিক সমাবেশে পদদলিত হয়ে কয়েকজন মানুষের মৃত্যু হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর রজনীকান্ত গভীর শোক প্রকাশ করেন। তিনি তামিলনাড়ু সরকারের প্রতি আহ্বান জানান যেন আহতদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে যথাযথ সহায়তা প্রদান করা হয়। তাঁর এই মানবিক আহ্বান প্রমাণ করে, রজনীকান্ত শুধু পর্দার নায়ক নন, মানবতারও এক অবিচল প্রতীক।

চলতি বছর ১৪ আগস্ট মুক্তি পেয়েছে তাঁর সর্বশেষ সিনেমা ‘কুলি’, যার পরিচালক জনপ্রিয় নির্মাতা লোকেশ কঙ্গরাজ। এতে তাঁর সঙ্গে অভিনয় করেছেন নাগার্জুনা, আমির খান ও শ্রুতি হাসান। ছবিটি মুক্তির পরই বক্স অফিসে বিপুল সাড়া ফেলে এবং প্রমাণ করে, সাত দশকের জীবনের পরও রজনীকান্তের জনপ্রিয়তা অটুট। বয়স কিংবা সময়, কোনোটিই তাঁর দীপ্তিকে ম্লান করতে পারেনি।

রজনীকান্তের জীবনের গল্প যেন এক অনুপ্রেরণার উপন্যাস। বাস কন্ডাক্টর হিসেবে জীবনের শুরু, এরপর ধীরে ধীরে উঠে আসা ভারতীয় সিনেমার সর্বোচ্চ শিখরে। অথচ তিনি আজও সেই আগের মতোই বিনয়ী, সাধারণ, এবং ঈশ্বরবিশ্বাসী একজন মানুষ। তাঁর প্রতিটি কাজ, প্রতিটি আচরণ শেখায়-জীবনের প্রকৃত সাফল্য আসে যখন খ্যাতির আড়ালে মানুষ নিজের সরলতাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।রজনীকান্তের হিমালয় সফরের ছবিগুলো শুধু একটি ভাইরাল মুহূর্ত নয়, বরং তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যতই আলো ছড়াও না কেন, শান্তি খুঁজে পাওয়া যায় কেবল সরলতায়, বিনয়ে আর মানবিকতায়।