কোথায় আছেন নব্বই দশকের নায়িকা লিমা?

ফারহান তানভীর :

নব্বই দশকের ঢালিউডে যেসব নায়িকার নাম নিয়মিত আলোচনায় থাকত, লিমা ছিলেন তাঁদের একজন। অথচ আজ সেই নামটি অনেকের কাছেই প্রায় অচেনা। একসময় যিনি মাসের বেশির ভাগ দিন শুটিংয়ে ব্যস্ত থাকতেন, ক্যারিয়ারের মাঝপথেই নীরবে সরে যান সিনেমা জগৎ থেকে। তাঁর এই হঠাৎ হারিয়ে যাওয়াই আজও কৌতূহলের জন্ম দেয়।

অভিনেত্রী লিমা – ফেসবুক থেকে

বর্তমানে লিমা থাকেন মোহাম্মদপুরে। পাঁচতলা একটি বাড়ির দোতলায় তাঁর বসবাস। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই, এই বাসাতেই একসময় ঢালিউডের জনপ্রিয় এক নায়িকা থাকেন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একান্ত, নিরিবিলি জীবন কাটান তিনি। মিডিয়ার আলো কিংবা চলচ্চিত্র অঙ্গনের সঙ্গে তাঁর আর কোনো যোগাযোগ নেই।লিমার আসল নাম শামিমা আলী লিমা। জন্ম ১৯৭৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর, কুমিল্লার দাউদকান্দি এলাকায়, যা বর্তমানে তিতাস থানা হিসেবে পরিচিত। যদিও জন্ম কুমিল্লায়, বেড়ে ওঠা ঢাকায়। তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তাঁর বাবা মোহাম্মদ মোহর আলী একজন মুক্তিযোদ্ধা ও ব্যবসায়ী। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর ঢাকায় এসে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। শিল্পমনস্ক এই মানুষটি শুরু থেকেই মেয়ের সাংস্কৃতিক চর্চায় আগ্রহী ছিলেন, যদিও সমাজের নানা সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে।

অভিনেত্রী লিমা – ইউটিউব থেকে

খুব অল্প বয়সেই অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত হন লিমা। মাত্র নয় বছর বয়সে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় শিশু অনুষ্ঠান ‘অঙ্কুর’-এর মাধ্যমে তাঁর অভিনয়জীবন শুরু। মোহাম্মদপুরে বসবাসের সময় বিটিভির প্রকৌশলী কুট্টি ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরেই এই সুযোগ আসে। ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের পাশাপাশি নাচ ও গানের চর্চায় নিজেকে তৈরি করতে থাকেন তিনি।মাত্র ১৪ বছর বয়সে বড় পর্দায় নায়িকা হিসেবে অভিষেক ঘটে লিমার। কমল সরকার পরিচালিত ‘সুখের আগুন’ সিনেমার মাধ্যমে ঢালিউডে তাঁর যাত্রা শুরু। ছবিটি ব্যবসায়িকভাবে বড় সাফল্য না পেলেও লিমার অভিনয় নজরে আসে পরিচালক দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর। এর পর থেকেই তাঁর ক্যারিয়ারের গতি বদলাতে শুরু করে।

১৯৯৩ সাল থেকে টানা কয়েক বছর দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর পরিচালনায় একাধিক ছবিতে অভিনয় করেন লিমা। প্রায় আট বছরের ক্যারিয়ারে তিনি অভিনয় করেন ২৫টির মতো সিনেমায়, যার বেশির ভাগই ছিল ব্যবসাসফল। এই সময়েই ঢালিউডে তাঁর ব্যস্ততা চরমে পৌঁছে। সালমান শাহ, ওমর সানী, জসীম, বাপ্পারাজ, অমিত হাসান, রুবেল-সময়ের জনপ্রিয় প্রায় সব নায়কের সঙ্গেই কাজ করেন তিনি।১৯৯৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘প্রেমগীত’ সিনেমাটি লিমার ক্যারিয়ারে বড় মোড় এনে দেয়। এই ছবির মাধ্যমেই তিনি জনপ্রিয় নায়িকাদের তালিকায় স্থায়ী জায়গা করে নেন। একই ছবিতে অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান অভিনেতা ওমর সানীও। ‘আমার সুরের সাথি আয় রে’ গানটি আজও দর্শকের স্মৃতিতে জায়গা করে আছে। সে সময় ঢাকাই চলচ্চিত্রে লিমা ছিলেন আলোচিত ও ব্যস্ত এক নাম।

অভিনেত্রী লিমা – ফেসবুক থেকে

কিন্তু জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকার সময়ই হঠাৎ ঘটে ছন্দপতন। একসঙ্গে কয়েকটি ছবির কাজ দ্রুত শেষ করে নীরবে সিনেমাকে বিদায় জানান লিমা। শেষ কোন ছবিটি তাঁর, সেটিও স্পষ্টভাবে মনে নেই অনেকের। অভিনয় ছাড়ার পেছনে ছিল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, পারিপার্শ্বিক চাপ এবং শারীরিক পরিবর্তন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ওজন বৃদ্ধি পাচ্ছিল, যা তাঁকে মানসিকভাবে প্রভাবিত করেছিল। পাশাপাশি পরিবারও চাইছিল না, তিনি আর অভিনয়ে থাকুন। সব দিক ভেবেই তিনি নিজেকে গুটিয়ে নেন।চলচ্চিত্র ছাড়ার পর মোহাম্মদপুরে একটি বিউটি পার্লারের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন লিমা। এরপর ধীরে ধীরে তিনি মিডিয়ার চোখের আড়ালে চলে যান।

অভিনেত্রী লিমা – ফেসবুক থেকে

গত ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলচ্চিত্র অঙ্গনের কারও সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ নেই। বর্তমান প্রজন্মের অভিনেতা কিংবা নির্মাতাদের নামও তাঁর কাছে অপরিচিত।বর্তমানে তাঁর বেশির ভাগ সময় কাটে পরিবারের সঙ্গে। বাবা, বোন এবং বোনের সন্তানদের নিয়েই তাঁর জগৎ। বিশেষ করে মেজ বোনের তিন মেয়েকে ঘিরেই তাঁর যত ব্যস্ততা। নিজেকে তিনি এখন একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেই ভাবেন।নব্বই দশকের ঢালিউডে ছিল তীব্র প্রতিযোগিতা। অসংখ্য মেধাবী নায়িকার ভিড়ে নিজের জায়গা তৈরি করা সহজ ছিল না। সেই বাস্তবতা মেনেই কোনো অভিযোগ বা অভিমান ছাড়াই সিনেমা থেকে সরে গেছেন লিমা। হয়তো তাই তিনি আজও ঢালিউডের ইতিহাসে রয়ে গেছেন এক নীরব অধ্যায় হয়ে-যাঁর নাম কম শোনা যায়, কিন্তু পুরোপুরি বিস্মৃত হওয়া সম্ভব নয়।