ফারহান তানভীর :
“আমার মেয়ে জেন আলফা প্রজন্মের। তাই আমাকে তার কথা শুনতেই হয়। আমার মা আমাকে শাসন করতে গিয়ে চড় মারতেন, কিন্তু আমি তার সঙ্গে সেটা করতে পারি না-কারণ সে উল্টো আমাকেই চড় মেরে বসতে পারে।”নিজের মেয়েকে নিয়ে এমনটাই মন্তব্য করেছেন রানি মুখার্জি।তাঁর এই একটি মন্তব্যেই লুকিয়ে আছে প্রজন্মের ব্যবধান, প্যারেন্টিংয়ের বিবর্তন এবং সমাজের বদলে যাওয়া শক্ত কাঠামোর গল্প।

কথাটা শুনতে প্রথমে মজার লাগলেও, ভেতরে ভেতরে এটি অত্যন্ত গভীর এক সামাজিক সত্যকে স্পর্শ করে।একসময় সন্তান বড় করার সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি ছিল শাসন, ভয় আর কর্তৃত্ব। বাবা-মায়ের কথা মানা মানেই ছিল প্রশ্নহীন আনুগত্য। ভুল মানেই শাস্তি-আর সেই শাস্তির সবচেয়ে সহজ রূপ ছিল চড়। তখনকার সমাজ সেটাকে নির্যাতন মনে করত না; বরং মনে করত ‘ভালো করার জন্য প্রয়োজনীয়’। মা-বাবার হাতের চড়কে ভালোবাসার অংশ হিসেবেই ব্যাখ্যা করা হতো।কিন্তু সময় বদলেছে। আর সময়ের সঙ্গে বদলেছে শিশুরাও।

আজকের শিশুরা-বিশেষ করে জেন আলফা প্রজন্ম-তথ্যপ্রযুক্তির ভেতর বড় হচ্ছে। তারা প্রশ্ন করে, যুক্তি খোঁজে, নিজের মত প্রকাশ করতে জানে। তারা শুধু আদেশ মানার যন্ত্র নয়, বরং নিজের পরিচয় সম্পর্কে সচেতন মানুষ। এই প্রজন্মের কাছে ভয় নয়, সম্মানই বড় চালিকা শক্তি।রানি মুখার্জির বক্তব্যে যে ‘উল্টো চড়’ কথাটা এসেছে, সেটি নিছক রসিকতা নয়। এটি আসলে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত। এখন সন্তানের সঙ্গে সম্পর্কটা একমুখী নয়। বাবা-মাকে শুধু শাসক নয়, আলোচক, শ্রোতা এবং সহযাত্রী হতে হয়। এখানে জোর করে কিছু চাপিয়ে দেওয়ার জায়গা কমে এসেছে।এই পরিবর্তন অনেক অভিভাবকের জন্য অস্বস্তিকর। কারণ তারা নিজের শৈশবের অভিজ্ঞতা দিয়েই সন্তান মানুষ করতে চান। কিন্তু তারা ভুলে যান-যে পৃথিবীতে তারা বড় হয়েছেন, তাদের সন্তানরা সেই পৃথিবীতে বড় হচ্ছে না।

আজকের সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য, আত্মসম্মান আর ব্যক্তিস্বাধীনতা আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।চড় মারতে না পারার বিষয়টি আসলে দুর্বলতা নয় বরং এটি সচেতনতার পরিচয়। এটি বোঝায় যে অভিভাবক বুঝতে পেরেছেন-ভয় দিয়ে নয়, বিশ্বাস দিয়ে সম্পর্ক গড়া জরুরি। শাসনের জায়গা দখল করছে কথোপকথন আর কর্তৃত্বের জায়গায় আসছে বোঝাপড়া।রানি মুখার্জির এই মন্তব্য তাই শুধু একজন তারকার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়; এটি আজকের প্যারেন্টিংয়ের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। যেখানে সন্তানকে নিয়ন্ত্রণ করার চেয়ে তাকে বোঝা বেশি জরুরি, আর চড়ের চেয়ে চয়েস-অর্থাৎ পছন্দ ও স্বাধীনতা-বেশি কার্যকর।সম্ভবত এটাই ভবিষ্যতের পথ। যেখানে বাবা-মা আর সন্তানের সম্পর্ক ভয়ভিত্তিক নয় বরং পারস্পরিক সম্মানের উপর দাঁড়িয়ে থাকবে।