৫০০ টাকা পারিশ্রমিকের গায়ক আজ প্রতিটি কাজে নেন ১০ কোটি টাকা! কে এই গায়ক?

ফারহান তানভীর :

ছোটবেলায় বিয়ের অনুষ্ঠানে কিবোর্ড বাজিয়ে মাত্র ৫০০ টাকা আয় করতেন এক কিশোর। কখনো কখনো সেই টাকাটাও মিলত না-শুধু ধন্যবাদ আর একটু খাবারই ছিল তার প্রাপ্তি। সেই ছেলেটাই আজ কোটি কোটি টাকা আয় করা এক সংগীত সম্রাট। তবু তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, তখনকার মতো সুখ আর পান না। এই কথার মানুষটি অনিরুদ্ধ রবিচন্দ্র-দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার সংগীত জগতের সবচেয়ে শক্তিশালী নামগুলোর একটি।

ছবি : ইন্সটাগ্রাম

অনিরুদ্ধের উত্থানের গল্পটা কোনো তারকাপুত্রের সহজ যাত্রা নয় বরং এটি এক তরুণ সংগীতপ্রেমীর দীর্ঘ সংগ্রাম, অনিশ্চয়তা আর স্বপ্নের বাস্তব রূপ নেওয়ার গল্প। চেন্নাইয়ের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া এই তরুণ ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি গভীর আগ্রহী ছিলেন। পিয়ানো শেখা, স্কুল-কলেজে ব্যান্ডে বাজানো, ছোট মঞ্চে পারফর্ম করা-সব মিলিয়ে তার জীবন ছিল একেবারে গ্রাসরুট লেভেলের সংগ্রাম। বড় কোনো প্ল্যাটফর্ম ছিল না, ছিল শুধু স্বপ্ন আর প্রতিদিন নিজেকে প্রমাণ করার তাগিদ।২০১২ সালে তার জীবন পুরোপুরি বদলে যায়। “হোয়াই দিস কোলাভেরি ডি” গানটি মুক্তির পর মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায় এবং ইন্টারনেটে ঝড় তোলে। এই গান শুধু একটি হিট ট্র্যাক ছিল না; এটি ছিল অনিরুদ্ধের ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট।

ছবি : ইন্সটাগ্রাম

তরুণদের মধ্যে তিনি হয়ে ওঠেন কাল্ট ফিগার আর প্রযোজক-পরিচালকদের কাছে হয়ে ওঠেন নতুন যুগের সংগীত পরিচালক।এরপর তার ক্যারিয়ার গ্রাফ উল্কার গতিতে ওপরে উঠতে থাকে। “মাস্টার” সিনেমায় তার সংগীত সিনেমার আবেগ, উত্তেজনা ও স্টাইলকে নতুন মাত্রা দেয়। “লিও”তে তিনি আরও পরিণত কম্পোজার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন-ডার্ক, ইন্টেন্স ও আধুনিক সাউন্ডস্কেপ দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেন। বলিউডে তার সবচেয়ে বড় প্রবেশ ঘটে “জাওয়ান” সিনেমার মাধ্যমে, যেখানে শাহরুখ খানের মতো সুপারস্টারের সিনেমায় সংগীত করে তিনি প্যান-ইন্ডিয়া ও আন্তর্জাতিক দর্শকদের নজরে আসেন। এরপর সুপারস্টার রজনীকান্তের “জেলার”সহ আরও বড় বাজেটের সিনেমায় তার কাজ প্রমাণ করে দেয়-তিনি শুধু গান বানান না, সিনেমার ন্যারেটিভের সঙ্গে সংগীতকে একীভূত করে গল্প বলার এক নতুন ভাষা তৈরি করেন।

ছবি : ইন্সটাগ্রাম

তার জনপ্রিয়তা শুধু সিনেমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। কনসার্ট, লাইভ পারফর্মেন্স, আন্তর্জাতিক শো-সব জায়গায় অনিরুদ্ধ আজ একটি ব্র্যান্ড। এমনকি ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও তিনি পারফর্ম করেছেন, যা তার গ্লোবাল গ্রহণযোগ্যতার আরেকটি বড় প্রমাণ। একটি ক্রীড়া বিশ্বমঞ্চে পারফর্ম করা মানে শুধু সংগীতশিল্পী হওয়া নয়, বরং বিশ্বজনীন সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠা।আজ অনিরুদ্ধ একেকটি সিনেমার জন্য কোটি কোটি টাকা পারিশ্রমিক নেন। তার আয় আসে সিনেমা, কনসার্ট, ব্র্যান্ড এন্ডোর্সমেন্ট এবং বিভিন্ন সংগীত প্রকল্প থেকে।

অথচ তার সেই উক্তি-ছোটবেলায় ৫০০ টাকা আয় করে যে সুখ পেতেন, এখন কোটি টাকা আয় করেও তা পান না-এই কথাটি তার জীবনের সবচেয়ে মানবিক ও দার্শনিক দিকটি তুলে ধরে।এই বক্তব্য আসলে সাফল্যের এক নির্মম প্যারাডক্স। শুরুর সময়ের ৫০০ টাকা ছিল স্বপ্নের মতো, কারণ সেটার সাথে ছিল স্বীকৃতি, কৃতজ্ঞতা, আর নিজের ওপর বিশ্বাসের জন্ম। আর এখন কোটি টাকা হয়তো নিয়মিত আয়, কিন্তু সেই প্রথম জয়, প্রথম স্বপ্ন পূরণের উত্তেজনা, আর সরল জীবনের আনন্দ আর ফেরে না। অনিরুদ্ধের এই স্বীকারোক্তি শুধু একজন সংগীত পরিচালকের ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়, বরং আধুনিক সফল মানুষের মানসিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

ছবি : ইন্সটাগ্রাম

একটি ছোট বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী মঞ্চ-এই যাত্রা প্রমাণ করে প্রতিভা, অধ্যবসায় ও সুযোগ মিললে মানুষের জীবন কতটা বদলে যেতে পারে। তবে তার গল্প একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেয়, সাফল্যের শিখরে পৌঁছালেও মানুষের সবচেয়ে বিশুদ্ধ সুখ অনেক সময় লুকিয়ে থাকে জীবনের সবচেয়ে সাধারণ মুহূর্তগুলোর মধ্যে-যেখানে ৫০০ টাকা ছিল কোটি টাকার সমান আর ধন্যবাদ ছিল সবচেয়ে বড়